তুলিকা শইকীয়া

তুলিকা শইকীয়া |  জন্ম ১৯৭৭

অসমের দেড়গাঁওয়ের ইকরানি গ্রামে ১৯৭৭ সনে তুলিকা শইকীয়ার জন্ম হয়। ২০১৪ সালে লেখকের ‘চারিশাল গোসাঁনীর তেজ’ মুনীন বরকটকী পুরস্কার লাভ করে। কর্মসূত্রে কাকডোঙা তিনিয়ালি হাইস্কুলের শিক্ষয়িত্রী। পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লিখে থাকেন।

ভাষান্তর  |  বাসুদেব দাস

অন্তর্লীন

বন্ধের দিনগুলিতে সমগ্র অঞ্চলটা নির্জনতায় ডুবে থাকাটাই নিয়ম।মাসের চতুর্থ শনিবার,রবিবার এবং মে দিবসের বন্ধ মিলে এক সঙ্গে তিনটে বন্ধের দিন পড়েছে।প্রতিটি দিনেই নির্জীব বাড়িগুলির মধ্যে থমথমে পরিবেশে একা দাঁড়িয়ে থাকত একশো বছরের প্রাচীন বটগাছটা।ভিড়ের মধ্যে থাকার জন্য অনেক দিন আগেই গাছটাতে পাখিরা বাসা বাঁধা ছেড়ে দিয়েছে।বন্ধের দিনগুলিতে দুই একটা পাখি গাছটিতে বসে জিরিয়ে নেয়।সেই আকাঙ্খিত সান্নিধ্যের জন্যও বন্ধের দিনগুলিতে আগ্রহের সঙ্গে গাছটা পথ চেয়ে থাকে।

কিন্তু সেরকম হল না।শুক্রবার বিকেলবেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের তরফ থেকে পাঠিয়ে দেওয়া নোটিসটা গতানুগতিক ভাবে সময়টা পার হয়ে যেতে দিল না।শনিবার সকালবেলাই শুরু হয়ে গেল এক নিষ্প্রাণ ব্যস্ততা।

আদালত চৌহদের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে প্রসারিত ডালগুলি একটা সামিয়ানার মতো মেলে ধরে বিশাল বিশাল বটগাছটা দাঁড়িয়ে রয়েছে।আদালতের মূল গৃহ থেকেও পুরোনো এই বটগাছটি।স্থানীয় বিচার ব্যবস্থার পরিবর্তে সাহেবি ন্যায়ব্যবস্থা প্রবর্তন করার উদ্দেশ্যে একদিন এই আদালতগৃহ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল।অনেক গাছপালা কেটে ফেলতে হয়েছিল।অনেক চিন্তা ভাবনা করে বৃটিশ সাহেব চৌহদের সীমানায় দ্রুত বেড়ে উঠা বটগাছের চারাটা কেটে না ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অন্তর্যামী হয়ে অঙ্কুরিত হয়েছিল চারাগাছটা। সংস্পর্শে আসা প্রত্যেকের মনের ভাবগুলি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছিল গাছটার কাছে।অনেক সময় এই যাদুকরী শক্তিকে গাছটার অভিশাপ বলে মনে হত।ব্রিটিশ সাহেব আদালত প্রতিষ্ঠা করার সময় গাছটা নিজের ভেতর থাকা এই আশ্চর্যজনক শক্তির আভাস পেয়েছিল।অন্য গাছপালার অন্তর্ভাগ এইভাবে আলোড়িত না হওয়ার কথাও সেই বয়সেই বটগাছের চারাটা জানতে পেরেছিল।প্রথম অবস্থায় এই শক্তিকে চারাগাছটি আশীর্বাদ বলেই ভেবেছিল।পরবর্তী সময় সেই ধারণা ভুল ছিল বলে প্রমাণ করল।

সকাল আটটার সময় হিম্মৎ সিং এল।দুটো পথের সংযোগে সৃষ্টি করা কোণটাতে থাকা প্রথম গুমটিটা তিনি ভালোভাবে নিরীক্ষণ করলেন।তরণী সংঘের পেছনে থাকা পরিত্যক্ত জায়গাটাও তিনি দেখে এলেন।আপাতত সেই জায়গায় গুমটিটা স্থানান্তর করাই সবচেয়ে সহজ হবে।সঙ্গে্র কয়েকজন না আসা পর্যন্ত হিম্মৎ সিং অপেক্ষা করে বসে রইলেন।

অসমে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য চলে আসা গুরমৎ সিং একদিন গাছটার নীচে এমনিতেই পড়ে থাকা মাটিটাতে নিজের হাতে তৈরি এই গুমটিটা বসিয়ে নিয়েছিল।সেখানে বসে গুরমৎ সিং চশমা আর টর্চলাইট বিক্রি করতেন।একটা সময়ে গুরমিৎ সিঙের চশমা আর টর্চলাইটের চাহিদা একেবারে নাই হয়ে গেল।সেই গুমটিতে এখন ছেলে হিম্মৎ সিং কলম,আঠার টিউব,চকলেট,চানাচুর,চিপস আর কাটা সুপুরি বিক্রি করে।কাঠাল গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি গুমটিটার এক টুকরো কাঠও পচেনি।মরচে পড়ায় টিনে লাল রঙ করিয়ে নিয়েছিল।গতবছর এই রকম দিনে দ্বিতীয়বারের জন্য টিন দুটিতে রঙ লাগিয়ে নিয়েছিল।গুরমিৎ সিং আর হিম্মৎ সিঙের জীবন সংগ্রামের সাক্ষী ছিল বটগাছটা।

গত কুড়ি বছরে গাছটার নীচে আরও সাতটা গুমটি বসেছে।সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা গুমটিগুলিকে দেখলে মনে হয় যেন আদালতকে কেন্দ্র করে নয়,গাছটাকে কেন্দ্র করেই গুমটিগুলি দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আগেরদিন বলা অনুসারে সাড়ে আটটার মধ্যে আগে-পরে করে এসে পড়লেন মুজিদ আলি,মূহিধর গগৈ,অনিল দাস,গোপাল নাথ এবং পরিমল পাল।কুসুমের আসতে কিছুটা দেরি হল।একেবারে ধনশিরির তীর থেকে হেঁটে আসে।সবার মুখগুলি দেখার পরে একটা করুণভাবে সিক্ত হয়ে পড়ল গাছটা।আগের দিন নোটিস পাওয়ার পরে বজ্রাঘাত পরা কবুতরের মতো স্তব্ধ হয়ে পড়া মানুষগুলো আজ নির্বিকার। পেটের ভাত জোগাড় করাই যার একমাত্র সমস্যা তার আবার ভাবার সময় কোথায়।এই মুহূর্তে অবশ্য জায়গাটা খালি করে দেওয়াই তাদের কাছে প্রথম কথা। পেটের ক্ষুধাকে অবজ্ঞা করতে পারলেও বার অ্যাসোসিয়েশনের নোটিস কে অবজ্ঞা করা যায় না। প্রত্যেকের বুকের যন্ত্রণাটুকু আত্মস্থ করে নিল গাছটা।

পরম আত্মীয়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলিকে দেখে যেন গাছটা কিছুটা স্বস্তি পেল।সংকটে পড়ে সবাই ভুলে গেছে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং খামখেয়ালিপনা।

হিম্মৎসিঙের ভাবার মতোই প্রত্যেকেই ভেবেছিল –আপাতত নিজেদের গুমটিগুলি তরণীসংঘের পেছনে এমনিতেই পড়ে থাকা জায়গাগুলিতে রেখে দেবে।পরে সুবিধা করতে পারলে অন্য কোথাও নিয়ে বসাবে।কিন্তু সরাতে গিয়ে দেখা গেল –কল্পনা দেবী, গোপাল নাথ এবং হিম্মৎ সিঙের গুমটিগুলি ছাড়া অন্য গুমটিগুলি সরিয়ে এতদূরে নিয়ে যাবার মতো অবস্থায় নেই।কিছু কাঠ রীতিমতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর কিছু পচে গেছে।চালার টিনগুলিও খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই।ভেঙ্গেচুড়ে খড়ি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

সবাই মিলে ধরাধরি করে হিম্মৎসিং আজ গোপাল নাথের গুমটিগুলি সরিয়ে নেয়। কুসুম ছেলের সঙ্গে মিলে নিজেদের গুমটিটা ভেঙ্গে কাঠগুলি বেঁধে নেয়। ছেলের জন্মের পরে স্বামী উধাও হয়ে যাওয়া কুসুম নামের এই মহিলাটিকে আজ প্রথমবারের জন্য এতক্ষণ নীরব হয়ে থাকতে দেখা গেল। মুখরা বলেই কেউ মহিলাকে ঘাঁটাতে সাহস করে না। সুপুরি আর দলিল বিক্রি করার জন্য মিষ্টি কথার প্রয়োজন হয় না বলেই বাঁচোয়া।গাছটা কিন্তু জানে– মহিলার কথা যতটা কর্কশ, চেহারাটা যতই আকর্ষণহীন হোক না কেন,মনটা ততই নরম।

ফাগুনের প্রবল হাওয়া হয়ে ইতিমধ্যে সাহিত্য চর্চায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা রিনিকি বরুয়া এসে গাছের নীচে দাঁড়িয়েছেন।উচ্ছেদের বলি মানুষগুলির জন্য সহানুভূতিতে যেন গলে যাবেন বলে মনে হল। অন্যের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তোলায় রিনিকি বরুয়ার দক্ষতা গাছটাকে অবাক করল।মহিলাটির সাধারণ অথচ পরিপাটি বেশ-ভূষা এবং চোখে মুখে লেগে থাকা সরলতা যে কোনো মানুষকে আকৃষ্ট করবে।

আসলে রিনিকি বরুয়াকে প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করে থাকে নিজেকে অনন্য রূপে তুলে ধরার এক সচেতন প্রয়াস।অতি সযেতনে তিনি গোপন করে রাখা সেই প্রয়াস ও গাছটা স্পষ্ট দেখতে পেল।

মানুষকে চিনতে মানুষের ভুল হয়ই।ভুল হয় না কেবল এই যাদুকরী মহীরুহের। গাছটার দুঃখ-সুদীর্ঘ জীবনকালে অন্তর্যামী গাছটা একজন মানুষকে দেখতে পেল না যাকে বিশ্বাস করা যেতে পারে।মানুষই মানুষকে বিশ্বাস করে ঠগে যায়,মানুষই জানে মানুষের বিশ্বাসের সুযোগ নিতে।

বড়ো আগ্রহের সঙ্গে রিনিকি বরুয়া মানুষগুলিকে এটা ওটা নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন এবং অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে তাঁদের কথাগুলি শুনে গেলেন।উচ্ছেদের বলি গুমটিওয়ালাদের অপ্রকাশিত বেদনাটুকু যেন রিনিকি বরুয়ার চোখে মুখে ফুটে উঠল। লেখিকার সহমর্মিতাকে কেউ সন্দেহ করলনা। কেবল গাছটারই মহিলাটিকে শবদেহের গন্ধ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো শকুন বলে মনে হতে লাগল।

ওহো। বেঁচে থাকা জিনিসে শকুন চোখ দেয় না। কিন্তু এই দরদি লেখিকা নিজের প্রয়োজনে জীবিত মানুষের ছালও ছাড়িয়ে নিতে পারেন।

আগের দিন নোটিশ জারি করা মনোজ হাজরিকা বাজারের উদ্দেশ্যে এসেছিল। গাছের ছায়ায় সাইকেলটা রেখে তিনি দাঁড়ালেন এবং ত্রাণকর্তার ভঙ্গিমায় মানুষগুলির কাছে এগিয়ে এলেন।

এই জায়গায় একটা মার্কেট হবে।সেখানে আপনাদের একটা করে ঘর দেওয়া হবে।আপনারা সবাই পাওয়ার পরে অন্যকে রুম দেওয়ার কথা ভাবা হবে।

মনোজ হাজরিকার কথা যেন তারা শুনতেই পেল না। সবাইকে নিজের নিজের কাজ মনোযোগের সঙ্গে করতে দেখে মনোজ হাজরিকা অবাক হলেন।তিনি ভেবেছিলেন –এই কথা শোনার পরে লোকগুলি তাকে খাতির করতে শুরু করবে।হতাশ না হয়ে তিনি পকেট খুঁজে এক টুকরো কাগজ বের করলেন।হতে চলা মার্কেটটার একটা নক্মা এঁকে তিনি লোকগুলির মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন।

নতুন করে শুরু হতে চলা মার্কেট সম্পর্কে কারও মনেই বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। আমানত ধন,মাসিক ভাড়ার না মেলা অঙ্ক করে তারা মাথা ঘামাতে রাজি নয়। রাস্তাটার সঙ্গে গাছটার ছায়া মিলে ৪৫ ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করার সময় কল্পনা দেবীও এসে হাজির হলেন। সাজতে গুজতে ভালোবাসা মহিলাটি আজ টকটকে রঙের একটা লাল শড়ি পরেছেন।গুমটির সঙ্গে মানুষটিকে কোনোমতেই মানায় না। বয়সের সঙ্গে ভাটিতে চলা যৌবনকে অনেক যত্নের সঙ্গে ধরে রেখেছেন। কেরানি বাবার আদরের মেয়ে ছিলেন কল্পনা দেবী। পেন্সনের টাকা দিয়েই মা-মেয়ের সংসার টেনে-টুনে চলে যেত। কিন্তু কারও পত্নী হওয়ার পথ চেয়ে থাকতে থাকতে একটা সময়ে সময় যেন আর পার হতে চাইত না। একাকীত্ব দূর করার জন্য কিছু একটাতে ব্যস্ত হয়ে থাকার কথা ভাবলেন। একজন কাকু ডিসি’র অফিসে খোঁজখবর করে দলিল বিক্রি করার পারমিশন বের করে দিল।কল্পনা দেবী প্রথম দিকে আদালতের আশেপাশেই একটি ছোটো রুম নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন।তবে এরকম একটি জায়গায় রুম পাওয়া কি মুখের কথা ? রুম খোঁজার সময় গাছের নীচে এমনিতেই পড়ে থাকা একটা গুমটির ওপরে চোখ পড়ে। গুমটির মালিক গুমটি ছেড়ে শাক-সব্জির ব্যবসা শুরু করেছিল।কল্পনা দেবী লোকটিকে খুঁজে বের করেছিলেন এবং ২৫০০ টাকার বিনিময়ে গুমটিটা নিজের নামে করে নিয়েছিলেন।প্রথম দিকে গুমটিতে বসতে লজ্জ্বা বোধ করা কল্পনা দেবী ব্যাপারটাতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং দলিল বিক্রি করে টাকা রোজগার করার সমস্ত কায়দা কানুন শিখে নিয়েছিলেন।

একের পরে এক প্রেমিকাদের দ্বারা প্রতারিত হওয়ার পরেও কল্পনা দেবী প্রেমের ওপর আস্থা হারাননি।খুব দ্রুত রাস্তার ওপারে থাকা ছাপাখানার মালিকের প্রেমে মজে গেলেন কল্পনা দেবী।কল্পনা দেবীর প্রেম কাহিনি আদালতের এই গতানুগতিক অঞ্চলকে রসাল করে তুলেছিল।

কেবল নিজের গুমটিটাকে তখন পর্যন্ত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কল্পনা দেবীর মনটা মুষড়ে পড়ল।উগ্র প্রসাধনের উজ্জ্বলতাও তাঁর মুখের বিষাদের ছায়া ঢেকে রাখতে পারল না। প্রেমিকের কাছ থেকে আজ পর্যন্ত একটা ফোন কলও আসেনি।অথচ আগের দিন বিদায় নেবার সময় মানুষটা বারবার চিন্তা করতে নিষেধ করেছিল।দুজন মানুষকে নিয়ে আসার কথা বলেছিল।

রিনিকি বরুয়া স্বাভাবিক কৌ্তূহল বশত কল্পনা দেবীকে স্মরণ করছিল। কল্পনা দেবী ব্যাগের ভেতর ঢুকে থাকা ফোনটা হাতে নিয়ে কিছু সময় ভেবে নিলেন।যখন তখন ফোন করলে মানুষটা খারাপ পায়।লক্ষীস্বরূপা পত্নীর মনে সন্দেহের বীজ বপন করে ঘরটাকে অশান্তির আবাসস্থল করে তুলতে চান না। কল্পনা দেবীর ও তাকে অসন্তুষ্ট করে তুলতে মন চায় না।

অস্থির হাতে কল্পনা দেবী মোবাইলের বোতাম টিপলেন।লোকটির ফোন অফ করা আছে।

আপনি কার ও জন্য অপেক্ষা করছেন? তরণী সঙ্ঘের কার্যালয়ের সিঁড়িতে বসে থাকা কল্পনা দেবীর পাশে বসে রিনিকি বরুয়া জিজ্ঞেস করলেন।একজন অপরিচিত মানুষকে সোজাসুজি নিজের প্রেমিকের কথা বলতে কল্পনা দেবীর লজ্জ্বা হল।

‘একজন মানুষ আসার কথা ছিল।’

‘কোনো আপন জন?’

‘হ্যাঁ,আপন জনই।’

কল্পনা দেবীর চোখ ছলছলে হয়ে এল।‘কোনো অসুবিধা হয়েও থাকতে পারে।’

ভূমিধর গগৈ, মুজিদ আলি, পরিমল পাল এবং অনিল দাস নিজের ভাগের কাঠ এবং টিনগুলি সাইকেলে বেঁধে নিল।কুসুমের ভাগেরটা নেবার জন্য একটা রিক্মার প্রয়োজন হল।এক কেজি চালের দামের চেয়েও রিক্মার ভাড়া গুণতে গেলে বেশি খরচ হবে।

কল্পনা দেবীর কথা-কাণ্ড কার ও পছন্দ না হলেও এই দিনটিতে মানুষটিকে একা ছেড়ে যেতে কারও ইচ্ছা হল না।সবার হয়ে কুসুমই বলল-এই যে তোরা চুপ করে বসেই থাকবি?দেখতে পাচ্ছিস না সবারই বাড়ি যাবার সময় হয়েছে।‘কল্পনা দেবী উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত ওদের কাছে পৌছে গেলেন।

‘আপনাদের কাজটুকু হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম।’
‘কোথায় রাখতে হবে বলে দিলেই হল।’
‘আপনারা যেখানে ভালো বুঝেন।’

সবাই মিলে ধরাধরি করে কাঠ দিয়ে তৈরি মজবুত ঘুমটিটা ভেঙ্গে নিয়ে পরিত্যক্ত জায়গাটিতে হাজির হল।সোজাসুজি রাস্তার ওপারে কল্পনা দেবীর প্রেমিকের ছাপাখানাটা?না,না,আজ আর তাদের সম্পর্ক নিয়ে কেউ রসিকতা করল না।প্রতিটি মানুষ নিজের নিজের বাড়ি ফিরে যাবার পরেও রিনিকি বরুয়া কিছু সময় বসে রইলেন।এতদিন পর্যন্ত তিনি মধ্যবিত্তীয় জীবনের জটিলতাকে কেন্দ্র করেই গল্প-উপন্যাস লিখেছেন।নিজের লেখাগুলি একঘেয়েমি হয়ে উঠেছে বলে নিজেই বুঝতে পারছেন।দলিত-বঞ্চিতদের নিয়ে লেখায় এক ধরনের কৃতিত্ব রয়েছে।প্রথমবারের জন্য তিনি সর্বহারাদের নিয়ে একটা গল্প রচনা করবেন।তাঁর অনুরাগী সমালোচকরা নিশ্চয় তাঁর এই উত্তরণের সুন্দর ব্যাখ্যা দেবে।গল্পের চরিত্রগুলির সঙ্গে একটা সেলফি উঠার কথাও রিনিকি বরুয়ার তখনই মনে পড়ল।

মূল শিকড়ের একটা অংশ হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণায় গাছটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছিল।গাছটার অজান্তে গুমটিগুলি গাছটার একটা অংশ হয়ে পড়েছিল। আদালতের সীমানারও একটা অংশ ছিল গুমটিগুলি।অনেক পরিবর্তনের সাক্ষী শতবর্ষ অতিক্রম করা গাছটা। মৃদু বাতাসের গতিতে আসা পরিবর্তন কখন যে তুফানের গতি লাভ করেছে গাছটা তা বুঝতেই পারেনি।নরখাদকের মতোই মানুষেরও দাঁত-নখ বাড়তে লাগল।সঙ্গোপনে লুকিয়ে রাখা দাঁত-নখ গুলি সুযোগ পেলেই আঁচড়াতে কামড়াতে চায়।সেই আঁচরে অন্তর্যামী বটবৃক্ষ ও ক্ষতবিক্ষত হয়।

দাঁত-নখ যত তীক্ষ্ণ হয় মানুষ ততই শক্তিশালী হয়।তীক্ষ্ণ থাবা উকিল শান্তনু বেজবরুয়াকে একজন শক্তিশালী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।শিয়ালের মতো ধূর্ত এবং বিড়ালের মতো লোভী মানুষটা অনেক অসাধ্য সাধন করে নিজের বৃত্তিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়েছেন। একনাগারে দুবার করে তিনি বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হয়েছেন।নিজের চেষ্টায় সম্পাদকের পদে অধিষ্ঠিত করিয়েছেন তাঁর অনুরাগী প্রকাশ পূজারীকে।অবশ্য জাতীয় সংগঠন একটার রাজ্যিক পর্যায়ের সদস্য হিসেবে প্রকাশ পূজারীর যে গুরুত্ব যে নেই তা কিন্তু নয়।দুইজনেরই অনেক কথা-বার্তার সাক্ষী বৃদ্ধ গাছটা।

‘যাতে ভালো হয় তাই করে যাব।অন্যকে জিজ্ঞেস করে কাজ করার মানুষ নয় এই বেজবরুয়া।’
‘দশজনে দশ কথা বললে আমরা কার কথা মানব। সেভাবে কী আর কোনো কাজ হয় নাকি?’
‘এই ফাঁকা জায়গাটাতে সুন্দর একটা ক্যান্টিন তৈরি করব।টাইপিস্টদের উঠিয়ে দেব।’
‘ফাইনান্স হয়ে যাবে।পৌ্র-পিতা এবং লোকাল মিনিষ্টারকে নিয়ে একটা প্রোগ্রাম করতে হবে।’
‘আমার একটা ফোনেই শিল,বালি ইট এসে যাবে।’

গাছটা জানে –জাতীয় সংগঠনের নেতা হলে একটাই সুবিধা।কিন্তু অগনতান্ত্রিক হাতগুলিতে কীভাবে গণতন্ত্রের ধ্বজা সমর্পিত হয় সে কথা গাছটা বুঝতে পারে না। সমগ্র বার অ্যাসোসিয়েশন এখন দুজন মানুষের থাবায় বন্দি।এই মণিকাঞ্চন সংযোগের কাছে সবাই নত হয়ে থাকে। দুজনের আগ্রাসনকে মেনে নিতে না পারা মানুষগুলিও গাছের নীচে দাঁড়িয়ে মনের ক্ষোভ উগরে দেয়।নিজেকে মার্ক্মবাদী বলে দাবি করা দীপেন দত্ত এবং দিগন্ত ভূঞা গুমটিগুলি উঠিয়ে নিয়ে যাবার জন্য দেওয়া নোটিসের সম্পর্কে কথা বলতে বলতে গাছটার নীচ দিয়ে পার হয়ে গিয়েছিল।

‘শ্রেণি সমাজে এই ধরনের দ্বন্দ্ব থাকবেই।’
‘উৎপাদন এবং বিতরণ ব্যবস্থাই সমস্ত কথা নিয়ন্ত্রণ করে।’
‘মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসই শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস নয় কি?’
‘দ্বন্দ্বের মাধ্যমেই সমাজের বিকাশ ঘটে।’
‘এক কথায় মার্ক্ম উন্মোচন করা সত্যই শেষ সত্য। মার্ক্ম দেখানো পথই একমাত্র পথ’।
‘এই দ্বন্দ্বের পরিণতি স্বরূপই একদিন সমাজবাদ প্রতিষ্ঠা হবে।’
‘কিন্তু মার্ক্মকে কতজন জানে?’
‘সেটাই তো সমস্যা।’

যে মার্ক্মকে জানাটা এত গর্বের বিষয় হতে পারে সেই মার্ক্মের সান্নিধ্য লাভ করার সৌভাগ্য গাছটার হল না।কিন্তু এদের দেখে দেখে গাছটা বুঝতে পেরেছে –একটা নিশ্চিত পথ মার্ক্ম নামের মানুষটা দেখিয়ে যাবার পরেও একটা শোষণমুক্ত সমাজ সৃষ্টি না হওয়ার কারণটা এরা নিজেরাই।নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্যই এঁদের মার্ক্মের প্রয়োজন।একঝাঁক ধুলোয় ধূসরিত বাতাস গাছটাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে খসে পড়ল আয়ু শেষ করে হলদে হয়ে পড়া কয়েকটি পাতা। সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ল। গাছটার দিকে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে এল কিছুদিন আগে তৈরি করা বিশাল ঘরটির ছায়া। ছায়া নয় যেন একটা দৈত্য।একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য বার অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সমিতি গাছটার নীচে বসল। মনোজ হাজরিকা তৈরি করে দেওয়া চেয়ারে তারা মুখোমুখি বসে নিল। যা করার সভাপতি সম্পাদকই করবে। তবু বসাটা নিয়ম। কার্যকারী কমিটির সদস্য হিসেবে নিজের গুরুত্বটুকু ধরে রাখার জন্য এভাবে বসাটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

‘ভাবতেই পারিনি আজকের ভেতরে তাঁরা জায়গাটা খালি করে দেবে বলে।’
‘আগামীকাল থেকেই মিস্ত্রির ব্যবস্থা করে দিই।’
‘তরণীদের ও কোনোভাবে যদি রাজি করানো যেত।’

প্রকাশ পূজারীর কথা শুনে শান্তনু বেজবরুয়ার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠল।তরণী সংঘের পুরোনো টিনের ঘরটা ভেঙ্গে বার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে একটা আরসিসি ঘর তৈরি করে দেবার কথা বলেছিলেন তিনি। গ্রাউণ্ড ফ্লোরটা তরণীদের হবে এবং ছাদটা বারের হবে। কথা শুনে এত দিনে একে অপরের জন্য অস্ত্র শাণাতে থাকা তরণীরা এক হয়ে পড়ল।ইতিমধ্যে তৈরি করা নতুন বিল্ডিংটার জন্য মাপ-জোখ করার সময়েও তাঁরা মৃতদেহ পাহারা দেওয়া শকুণের মতো সীমা রক্ষা করছিল।নিজের চেয়ে নিচুস্তরের কিছু মানুষের কাছে হেরে যাবার অপমান বেজবরুয়ার মনে কাঁটার মতো বিঁধছে।পূজারী খুঁচিয়ে দেওয়ায় কাঁটাটা পুনরায় বিঁধতে লাগল।

শান্তি জয়সোয়াল প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলেন-‘গাছটার কী হবে?’

সবাই মাথা তুলে গাছটার দিকে তাকালেন। কেবল শান্তনু বেজবরুয়া গাছের দিকে না তাকিয়ে বললেন-‘কেটে ফেলতে হবে।’

বেজবরুয়ার কথার দৃঢ়তা গাছটার অন্তরাত্মাকে ঝাঁকিয়ে দিল।সীমান্ত চলিহা একটা প্রকৃ্তি প্রেমী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য।নিজেই মেম্বার হয়ে থাকা একটা কমিটি এই ধরনের একটা বিশাল গাছ কাটিয়ে দিলে সংগঠনের কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।কিন্তু শান্তনু বেজবরুয়াকে কিছু বলার সাহস সীমান্ত চলিহার নেই।সুরটা যতটা সম্ভব নরম করে তিনি বললেন-‘গাছটা কেটে ফেললে লোকেরা হইচই করবেনা কি?’

‘আমার সঙ্গে মিডিয়া আছে।’পলাশ জানে সীমান্তের সমস্যা কোথায়।গাছটার জন্য এরকম জায়গায় এতটা মাটি ফেলে রাখা যায় না।দুই বছর আগে গাছটার ডাল ভেঙ্গে পড়ে নীচের দুটো গাড়ি ভাঙ্গার কথা বোধহয় ভুলে গেছ।এই জায়গা এরকম একটি গাছের জন্য নয়।গাছটা কাটার আগে দেবদারু বা পাইনের দুটো চারা লাগিয়ে নিলেই হবে।’

লোকগুলির ছায়াগুলি বাড়তে বাড়তে গাছটাকে স্পর্শ করার মতো হল।গাছটার ভেতরটা যেন শিঊরে ঊঠল।গাছটাকে ছিন্নভিন্ন করার মতো ছায়াগুলিরও যেন সূঁচলো দাঁত আছে,নখ আছে।নিজের ভেতরে গাছটা আসন্ন মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি চালাল।

দুদিন পরে আর নিজের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।এক্মকেভেটর লাগিয়ে শিকড় গুলিও মাটি খুঁড়ে উপড়ে ফেলা হবে।বিশাল বটবৃক্ষটার দেহ চিড়ে তক্তা করে ঘর সাজানোর কাজে ব্যবহার করা হবে নিশ্চয়।

কিন্তু এই যাদুকরী শক্তির কী হবে?গাছটার রিনিকি বরুয়ার কথা মনে পড়ল।এই শক্তির দ্বারাই রিনিকি বরুয়া অনেক সত্যকে কলমের সাহায্যে উলঙ্গ করে দেখাতে পারত।

কিন্তু রিনিকি বরুয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু?

অনেক সময় ভাবনা চিন্তা করার পরে গাছটা সিদ্ধান্ত নিল –মানুষের এই ধরনের শক্তির অধিকারী না হওয়াই ভালো।