রোবের্তো বোলানিও

রোবের্তো বোলানিও ।  জন্ম  ২৮ শে এপ্রিল, ১৯৫৩

লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের মহান উত্থান বা ‘এল বুম’ পরবর্তী সময়ের অন্যতম ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও কবি রোবের্তো বোলানিও ১৯৫৩ সালের ২৮ শে এপ্রিল চিলের সান্তিয়াগো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। সত্তর-এর দশকে ‘ইনফ্রারিয়ালিস্কো কবিতা আন্দোলন’-এ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। চিলে, এল-সালবাদর, ফ্রান্স, মেহিকো এবং স্পেন জুড়ে বিচিত্র পেশায় নিযুক্ত থেকেছেন তিনি, ভবঘুরের মতো উত্তল ও অবতলতায় জীবনকে যাপন করেছেন। ২০০৩ সালের ১৫-ই জুলাই মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে স্পেনের বার্সেলোনায় লিভারের অসুখে মৃত্যু হয় তাঁর।

১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘লস দিতেকটিভস সালভাখেস’। ‘নকতুরনো দে চিলে’, ‘লা লিতেরাচুরা নাজি ইন আমেরিকা’, ‘এসত্রেইয়া দিসতান্তে’, ‘আমুলেতো’, ‘এল তেরের রেইখ’ তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ২০০৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তাঁর অত্যন্ত আলোচিত উপন্যাস ‘২৬৬৬’। ‘ইয়ামাদাস তেলিফোনিকাস’ এবং ‘এল গাউচো ইনসুফরিব্লে’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্প সংগ্রহ।  ‘লস দিতেকটিভস সালভাখেস’ উপন্যাসটির জন্য ১৯৯৯ সালে ‘রোমূলো

ভাষান্তর ।।  শৌভিক দে সরকার

 

এনরিকে মার্তিন

একজন কবি সবকিছু সহ্য করতে পারে। এর মানে হলো একজন সাধারন মানুষ সবকিছু সহ্য করতে পারে কিম্বা নাও পারে, কিন্তু একজন কবিকে সবকিছু সহ্য করতেই হবে। এই বিশ্বাস নিয়েই বেড়ে উঠেছিলাম আমরা। এই কথাটা একদিক থেকে সত্যি কিন্তু এরকম জীবন কাটাতে গেলে ধ্বংস, পাগলামো, মৃত্যুর মুখোমুখি হতেই হবে।

বার্সেলোনায় যাওয়ার কয়েক মাস পরেই এনরিকে মার্তিনের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। আমার মতো সেও ১৯৫৩ সালে জন্মেছিল আর আমার মতো সেও কবিতা লিখত। কাস্তিলিয়ান আর কাতালান ভাষায় কবিতা লিখত এনরিকে। কিছুটা আলাদা হলেও দুটো ভাষার ব্যবহার একই রকম ছিল। ওর কাস্তিলিয়ান কবিতাগুলো খুব ভাবালু, আবেগময় এবং বেশিরভাগ সময়েই বেশ জগাখিচুড়ি টাইপের হতো। খুব বেশি নিজস্বতা ছিল না ওর কবিতায়। মিগুয়েল এরনান্দেখের খুব ভক্ত ছিল এনরিকে। মিগুয়েল এরনান্দেখ নিজে খুব ভালো কবি ছিলেন কিন্তু খুব খারাপ কবিতা যারা লিখত তারাই ওনার বেশি ভক্ত (আমার বক্তব্যটা খুব সোজা, এরনান্দেখের কবিতায় দুঃখ- কষ্ট ব্যাপারটা খুব বেশি থাকত আর খারাপ কবিরা তাদের অল্প বয়সে ল্যাবরেটরির জন্তুদের মতোই দুঃখ- কষ্ট পেত। তাই তারা ওনার কবিতা খুব পছন্দ করত।) ছিল। ওর কাতালান ভাষায় লেখা কবিতাগুলো অবশ্য তুলনামূলক ভাবে একটু ভালো ছিল। সত্যি ঘটনা কিম্বা প্রতিদিনের জীবনযাপন নিয়ে কবিতাগুলো লিখত এনরিকে। আর বন্ধুদেরকেই একমাত্র পড়াত সে। (অবশ্য কাস্তিলিয়ানে ও যা কবিতা লিখত, সেগুলিও এমনসব ছোটখাটো ম্যাগাজিনে ছাপা হতো যে আমার মনে হয় ওর বন্ধুবান্ধব ছাড়া কেউ সেগুলি পড়ত না আর কাতালান কবিতাগুলি ও আমাদের বারে বসে পরে শোনাত)। এনরিকের কাতালানও খুব একটা সুবিধার ছিল না (ওর অনেকগুলি ব্যাপারের মধ্যে এটাও আমি বুঝতাম না যে অন্য একটা ভাষা, যেটাতে ওর খুব ভালো দখল নেই, সেটাতে ও ভালো কবিতা লিখত কি করে)। কাতালান, ব্যকরণের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি ও ভালো মতো জানত না। মোদ্দা কথা কাস্তিলিয়ান বা কাতালান কোন ভাষাতেই ভালোমত লিখতে পারত না এনরিকে। তবে ওর কয়েকটা কবিতা আমার মনে আছে। আবেগ, নস্টালজিয়া ছিল কবিতাগুলিতে। আমার অল্প বয়সের কথা মনে পড়ে যায়। এনরিকে চেয়েছিল যে ও একজন বড় কবি হবে আর খুব চেষ্টাও চালিয়েছিল সেজন্য। কোন সমালোচনার তোয়াক্কা না করে অন্ধের মতো খাটত। মনে হতো হলিউডের সিনেমাগুলোতে ভিলেনরা মাছির মতো পড়ছে কিন্তু  হিরোর গুলি খাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শেষমেশ অবশ্য ওর এই খাটনি কিছুটা কাজে এসেছিল। একটা আলোর বৃত্ত তৈরি হয়েছিল হয়েছিল ওর চারদিকে যেটা বাচ্চা কবি আর বুড়ি বেশ্যারাই শুধু পছন্দ করত।

আমার তখন পঁচিশ বছর বয়স ছিল আর মনে হতো জীবনের সবকিছুই আমার দেখা হয়ে গিয়েছে। এনরিকে কিন্তু একদম উল্টোটা ভাবত। ও মনে করত জীবনে অনেককিছু করতে হবে ওকে। প্রথম যে কাজটা ও করল, সেটা হল একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করবে বলে ঠিক করল। নিজের জমানো পয়সা দিয়েই ম্যাগাজিনটা বের করার কথা ভাবল (পনের বছর বয়স থেকেই পোর্ট- এর কাছে কোন একটা অফিসে কাজ করত ও)। শেষ মুহূর্তে অবশ্য এনরিকের কয়েকজন বন্ধু (ওদের মধ্যে আমার এক বন্ধুও ছিল) ঠিক করেছিল যে প্রথম সংখ্যাতে আমার কবিতা ছাপবে না। আমার বলতেও খুব লজ্জা লাগে যে ঘটনাটার পর আমাদের বন্ধুত্বও একটু টাল খেয়ে গিয়েছিল। এনরিকে অবশ্য বলত যে এটা চিলের ঐ বন্ধুর জন্যই ঘটেছিল। সেই বলেছিল যে একই লিটল ম্যাগাজিনে দুজন চিলের কবির কবিতা বেমানান লাগবে। তাই সে আমার কবিতা বাদ দিয়েছিল। যা হোক, তখন আমি পর্তুগালে ছিলাম। ফিরে এসে আমার খুব প্রেস্টিজে লাগল। আমি ঠিক করলাম ঐ ম্যাগাজিনের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখাটা ঠিক হবে না আমার পক্ষে। ওর কোন অজুহাত আমি কানে তুললাম না। ম্যাগাজিনটা থেকে আমি সরে আসলাম।

মাঝে ওর সঙ্গে বেশ কিছুদিন দেখা হলো না। অবশ্য গথিক কোয়ার্টারের বারগুলিতে মাঝেমধ্যেই চেনাশোনা কারও সঙ্গে দেখা হতো আর ওর খবর শুনতাম। ওদের কাছেই শুনলাম যে ম্যাগাজিনটা (যেটার নাম রেখেছিল ‘হোয়াইট রোপ’, আমি নিশ্চিন্ত যে ওটা অন্য কেউ ঠিক করে দিয়েছিল) প্রথম সংখ্যার পর আর বের হয় নি, শুনলাম নো বারিস জেলার কালচারাল সেন্টারে একটা নাটক করে লোকের টিটকিরি শোনার পর ও এখন আবার একটা ম্যাগাজিন শুরু করার কথা ভাবছে।

একরাতে আমাকে শোনানোর জন্য ও ফাইল ভর্তি কবিতা নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে এসে হাজির হলো। আমরা ডিনার করতে ক্যালে কোস্তার একটা রেস্তোরাঁয় গেলাম। ওখানে ও কয়েকটা কবিতা পড়ল। অদ্ভুত একটা আত্মতৃপ্তি আর ভয় নিয়ে ও আমার মন্তব্যর জন্য বসে থাকল। আমার মনে হলো যে আমি যদি ওকে বলি কবিতাগুলো খারাপ হয়েছে তাহলে ও আর কোনদিন আমার কাছে আসবে না। আর ফালতু তর্কের মধ্যে নিজেকে জড়াতেও ইচ্ছে করছিল না। আমি ওকে বললাম যে কবিতাগুলো খুব ভালো লেখা হয়েছে। কোন সমালোচনা করছি, এটা যেন ও ভেবে বসে সেদিকে খেয়াল রেখেই কথাটা বললাম ওকে। এমনকি বললাম, যে একটা কবিতা শুনে তো আমার লিওন ফেলিপের এক্সতেরেমাদুরা নিয়ে লেখা নস্টালজিক কবিতাটার কথা মনে পড়ে গেল। এনরিকে কোনদিন ওখানে যায় নি আর আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না যে ও আমার কথাটা বিশ্বাস করল কি না! ও জানত যে আমি স্যাঙ্গুইনেত্তি পড়েছি আর কিছুটা হলেও (খুব বেশি মাত্রায় না) আধুনিক ইতালিয়ান কবিতা পছন্দ করি। তাই এক্সতেরেমাদুরা নিয়ে লেখা কবিতাগুলো নিয়ে প্রশংসা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু ও ভান করল যে আমার কথা বিশ্বাস করেছে ও। বেশ খুশি খুশি ভাব নিয়ে ম্যাগাজিনটার কথা বলতে শুরু করল যেটা প্রথম সংখ্যার পর আর বের হয় নি। আমি ভালমতোই বুঝলাম যে ও আমার কথা বিশ্বাস করে নি।

তারপর আমরা স্যাঙ্গুইনেত্তি আর ফ্রাঙ্ক ও হারা-কে নিয়ে কথা বললাম (ফ্রাঙ্ক ও হারা-কে আমার এখনও ভালো লাগে কিন্তু স্যাঙ্গুইনেত্তিকে লেখা অনেকদিন আগেই পড়া ছেড়ে দিয়েছি), নতুন ম্যাগাজিনের কথা (কিন্তু একবারও আমাকে লেখার কথা বলল না) হলো। তারপর আমার ফ্ল্যাটের সামনের রাস্তায় ওকে ছেড়ে চলে এলাম। দু’এক বছরের মধ্যে ওর সঙ্গে আর দেখা হয়নি আমার।

সেসময় একজন মেহিকান মহিলার সঙ্গে থাকতাম আমি। এত ঝগড়া হতো আমাদের যে সবাই মনে করত ঝগড়া করতে করতেই মরবো আমরা। আর আমাদের থামাতে গিয়ে প্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজনরাও মারা পড়বে। একবার কেউ আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলে দ্বিতীয়বার আসত না। টাকাকড়ি একদম ছিল না আমাদের (যদিও ও বেশ বড়লোকের মেয়ে ছিল কিন্তু বাড়ি থেকে কোন সাহায্য ও নিত না), হোমারের যুদ্ধের মত চলত আমাদের ঝগড়াঝাঁটি, সবসময় একটা কালো মেঘ ঝুলে থাকত ঘরের ভেতর।

এরমধ্যে একদিন এনরিকে একটা ওয়াইনের বোতল আর ফ্রেঞ্চ প্যাটি নিয়ে হাজির হোল। দরজা খুলে ওকে দেখেই আমার কেন জানিনা মনে হলো, আমাদের যুদ্ধের শেষ দেখতে এসেছে (যদিও ওকে দেখে খুশিই হলাম যে আমার বান্ধবী ওকে দেখে ক্ষেপে যাবে ) ও। কিন্তু পড়ে যখন ও আমাদের ওর ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য নেমন্তন্ন করল আর ওর বান্ধবীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে বলল, তখন আমি বুঝতে পারলাম ও আসলে আমাদের দেখতে নয়, নিজেকে দেখাতে এসেছে আমাদের এখানে অথবা এমনটাও হতে পারে আমার মতামত ও এখনও পছন্দ করে। আমার বেশ বিরক্তিই লাগল। একে তো ওর হুট করে চলে আসাটা আমার আর ভালো লাগছিল না, এছাড়া তখন সবকিছুতেই আমার খুব বিরক্তি লাগত। লোকজন আমাকে এড়িয়ে চলত। তাই আমিও সবাইকে এড়িয়ে চলতাম। কিন্তু এনরিকে বারবার ওর ওখানে যাওয়ার কথা বলতে লাগল আর কেন জানিনা মেহিকান মহিলারও ওকে খুব পছন্দ হলো। শেষপর্যন্ত গেলাম ওর ওখানে। বার পাঁচেক একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করেছিলাম আমরা।

খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বন্ধুত্বটা আবার জোড়া লাগল- জোড়া লাগল বললে অবশ্য একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে কারন প্রায় সব বিষয়েই আমাদের মতের অমিল হতো। ওর ফ্ল্যাটটা (আমাদের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও ও অনেকদিন ওর বাবা- মায়ের সঙ্গে থাকত, পড়ে শুনেছিলাম ও তিনজন বন্ধুর সঙ্গে মেস করে থাকে, আমি অবশ্য কোনদিন যাইনি ওখানে) দেখে আমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বারিও দা গারসিয়াতে ওর ফ্ল্যাটটা বেশ বড়সড় ছিল। চারদিকে বই, ছবি আর রেকর্ড সাজানো ছিল। ওর বান্ধবীই মনে হয় সবকিছু সাজিয়ে রাখত। বেশ কিছু অদ্ভুত জিনিসপত্র ছিল ওর ওখানে। বুলগেরিয়া, টার্কি, ইসরায়েল আর ইজিপ্টে বেড়াতে গিয়ে ওরা ঐসব নিয়ে এসেছিল।  স্যুভেনির বলতে যা বোঝায় সেরকম ছিল না সেসব। তবে আমি সবচেয়ে বেশি অবাক হলাম, যখন ও সবার সামনে বললো যে ও কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে! খাবার টেবিলে আমার বান্ধবীর সামনে কথাটা বললেও (আমি তখন একটা বড় আরবি ছোরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম, যেটার ফলার দুপাশেই নকশা করা ছিল। কোন কাজে নিশ্চয়ই আসত না ছোরাটা।) আমাকে উদ্দেশ্য করেই কথাটা বলল এনরিকে। ওর মুখের হাসিটা দেখে আমার মনে হচ্ছিল যেন ও বলতে চাইছে, ও সব বুঝে গিয়েছে। নিজেকে বোকা না বানিয়ে, লেখক হওয়ার ভান না করেও শিল্প- সাহিত্যকে ভালোবাসা যায়, এটা ও বুঝে গিয়েছে।

ওর কথা শুনে মেহিকান মহিলাটি (খুব তাড়াতাড়ি ও খুঁত খুঁজে পেত) ভেবে নিল যে  এনরিকের কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হয় নি এবং ওকে ঐ ম্যাগাজিনের গল্পটা বলতে বাধ্য করল যেটায় আমার কবিতা ছাপা হয়নি। গল্পটা শুনে ও মতামত দিল যে এনরিকে তার ত্যাগের পেছনে যুক্তিগুলো ভালমত সাজাচ্ছে আর বলল, খুব বেশিদিন হওয়ার আগেই নতুন উৎসাহ নিয়ে আবার লেখায় ফিরে আসবে ও। এনরিকের বান্ধবীও ওর এই কথাগুলো পুরোপুরি না হলেও কিছুটা সমর্থন করল। দুজন মহিলাই মনে করছিল (ওর বান্ধবী অবশ্য খুব সঙ্গত কারনেই আমার বান্ধবীর ব্যাপারটা ভাবছিল) যে ওর চাকরিতে মনোযোগ দেওয়া- প্রোমোশন হয়েছিল ওর যার জন্য ওকে কার্তাজেনা আর মালাগাতে যেতে হতো যেটা সম্বন্ধে আমি আর খুব বেশি কিছু জানতে চাইলাম না- বাকি সময়টা ঘরে কাটানো, রেকর্ড আর গাড়ির পেছনে দেওয়াটা লিওন ফেলিপে আর স্যাঙ্গুইনেত্তিকে নকল করে সময় নষ্ট করার চাইতে অনেক বেশি কাব্যিক। ও আমার মতামত জানতে চাইলে (যেন ও কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়ায় কাতালান আর কাস্তিলিয়ান কবিতার সর্বনাশ ঘটে যাচ্ছে) আমি খুব বেশি কিছু বললাম না ওকে। শুধু বললাম যে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে ও। কিন্তু বুঝলাম যে ও আমার কথা বিশ্বাস করল না!

সেই রাতেই বা অন্য কোনও চারটে ডিনারের একটাতে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কথা উঠল। এটা অবশ্য খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কবিতা আর সন্তান- সন্ততি। আমার মনে পড়ছে (স্পষ্টভাবেই মনে পড়ছে) যে এনরিকে বাচ্চা নেওয়ার কথা বলছিল। মানে কোন মহিলার পেটে বাচ্চাটা হবে না! ওর পেটেই বাচ্চাটা নয় মাস থাকবে। বাচ্চা হওয়ার অভিজ্ঞতাটা ও পেতে চায়! আমার মনে আছে ও যখন কথাগুলো বলছিল আমার হাত- পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। খুব নরম করে মহিলা দুজন ওর দিকে তাকিয়ে ওর কথা শুনছিল। কিন্তু আমি টের পাচ্ছিলাম যে ওর কথাগুলো শুনেই আমি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছি। অনেক বছর পর ওরকম হয়েছিল। একটা তীব্র জ্বালা- কিছুক্ষনের জন্য ব্যাস! এনরিকের কথাটা আমাকে এমনভাবে বিঁধল যে আমি কিছু বলতে পারলাম না! চারজনের মধ্যে তিনজনই বাচ্চাকাচ্চা চাইছিল। একমাত্র আমিই চাইছিলাম না। কিন্তু জীবন এমনই একটা নোংরা আর রহস্যময় জিনিস! আমারই একমাত্র সন্তান আছে!

শেষ যেদিন আমরা একসঙ্গে ডিনার করছিলাম, (মেহিকান মহিলাটির সঙ্গে আমার সম্পর্কটা তখন একদম খাদের কোনায় চলে গিয়েছিল) এনরিকে একটা ম্যাগাজিনের কথা বলল যেটাতে ও লিখেছিল। যাক শুরু হল, আমি ভাবতে ভাবতেই ও বলল, ‘ঐ ম্যাগাজিনে আমরা দুজনেই লিখতাম’। ‘আমরা’- শব্দটা শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম! পড়ে বুঝলাম যে আমরা বলতে ও নিজের বান্ধবী আর ওর কথা বলছে। আমি আর মেহিকান মহিলা দুজনে একসঙ্গে (শেষবারের মতো ) ম্যাগাজিনটা দেখতে চাইলাম। ও ম্যাগাজিনটা নিয়ে এল। স্ট্যান্ডে যে সব পাতি ম্যাগাজিনগুলো পাওয়া যায়, ইউ.এফ.ও থেকে ভুতের গল্প, কলম্বিয়ার আদিম কোন জনজাতির খোঁজখবর আর দুনিয়ার আজগুবি খবরে ঠাসা থাকে যেগুলো, ওরকমই একটা ম্যাগাজিন। ‘কোয়েশ্চনস অ্যান্ড আন্সারস’- নাম ছিল ম্যাগাজিনটার। আমার মনে হয় ওটা এখনও বের হয়। আমি জিজ্ঞেস করলাম- আমরা দুজনেই জিজ্ঞেস করলাম যে ওরা কি লিখত ওখানে। এনরিকে (ওর বান্ধবী ডিনারের সময় একটা কথাও বলেনি সেদিন ) বলল যে উইক এন্ড গুলিতে ওরা ঐসব জায়গায় চলে যেত যেখানে ফ্লাইং সসার দেখা গিয়েছে। ওখানে গিয়ে ওরা লোকজনের ইন্টারভিউ নিত, আশেপাশে সবকিছু খুঁজে দেখত, গুহাগুলিও (সেই রাতেই এনরিকে বলল যে কাতালোনিয়ার পাহারগুলিতে অনেক গুহা আছে) দেখত, তারপর রাতে ক্যামেরা নিয়ে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে বসে থাকত। বেশিরভাগ সময়ে ওরা দুজনেই যেত, কখনও আবার পাঁচ- ছয় জনের দল নিয়ে বাইরে রাত কাটাত এনরিকে আর ওর বান্ধবী। ফিরে এসে একটা রিপোর্ট লিখত যেটার একটা অংশ ছবিসহ (বাকিটা কোথায় কে জানে!)  ‘কোয়েশ্চনস অ্যান্ড আন্সারস’-এ ছাপা হয়েছিল।

ডিনারের পর আমি এনরিকে আর ওর বান্ধবীর লেখা কয়েকটা আর্টিকেল পড়লাম। খুব বাজে- বোকা বোকা ছিল লেখাগুলি। একটা ছদ্ম বৈজ্ঞানিক ভাব, অকারণে বারবার শুধু সায়েন্স শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছিল। আমার কেমন লেগেছে, ও জানতে চাইল। আমার মতামতে যে ওর কিছু যায় আসে না, সেটা আমি ভালো করেই বুঝে গিয়েছিলাম। তাই কোন রাখঢাক না রেখেই বললাম যে লেখাটার অনেক কিছু পাল্টাতে হবে, ওর আরও অনেক কিছু শিখতে হবে। ম্যাগাজিনটার আদৌ কোন সম্পাদক আছে কিনা, এটাও জিজ্ঞেস করলাম ওকে।

ওর ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে আমি আর আমার মেহিকান বান্ধবী, দুজনেই খুব হাসাহাসি করলাম। ঐ সপ্তাহের শেষেই আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। ও রোমে চলে গিয়েছিল আর আমি বছর খানেকের জন্য বার্সেলোনাতেই থেকে গিয়েছিলাম।

তারপর অনেকদিন এনরিকের কোন খবর পাইনি আমি। মনে হয়, ওর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম আমি। গিরোনার কাছে একটা গ্রামে পাঁচটা বেড়াল আর একটা কুকুর নিয়ে (যদিও ওটা মেয়ে কুকুর ছিল) থাকতাম তখন। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খুব একটা দেখা হতো না আমার। মাঝেমধ্যে কেউ দু’এক দিনের জন্য আসত। আর কেউ এলেই শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনা কিম্বা মেহিকোর বন্ধুদের নিয়েই বেশি গল্প হতো। কিন্তু আমার মনে পড়ে, এনরিকেকে নিয়ে কেউ কোনদিন কিছু বলেনি। আমি দিনে একবার কুকুরটা আর বেড়ালগুলিকে নিয়ে খাবার কিনতে বাজারের দিকে যেতাম আর পোস্টঅফিসে গিয়ে আমার কোন চিঠি আছে কিনা খোঁজ নিতাম। বেশিরভাগ সময়েই মেহিকো সিটি থেকে আমার বোনের চিঠি পেতাম। জায়গাটা একদম পাল্টে গিয়েছে, শুনতাম। আর অন্য চিঠি বলতে মাঝেমধ্যে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কবি বন্ধুদের চিঠি আসত। যেগুলির উত্তরে আমি হাবিজাবি, খিটখিটে, মন খারাপ করা কথাবার্তা লিখতাম। চিঠিগুলি আমার মতোই হতো, বয়স ফুরিয়ে আসা, স্বপ্ন শেষ হয়ে আসা মানুষের মতো।

একদিন একটা অদ্ভুত চিঠি পেলাম। ঠিক চিঠি না! আমার প্রথম উপন্যাসটার প্রকাশকের দেওয়া একটা ককটেল পার্টির (যে পার্টিটাতে আমি যাইনি) কার্ডের পেছনে কেউ একটা ম্যাপ এঁকে পাঠিয়েছিল যেটার পাশে আবার এই নম্বরগুলি লেখা ছিলঃ

৩৮৬০ + ৪২৯৭৭ – ৪৬৯৯৩? + ৫১১৭৯-৫৮৮৯০৪ + ৯৬৬ – ৩৯১৪৬ + ৪৯৮৮২০৭৮৫৬

আর খুব স্বাভাবিকভাবেই যে কার্ডটা পাঠিয়েছিল তার নাম কোথাও লেখা ছিল না। প্রকাশকের দেওয়া পার্টিতে সে গিয়েছিল, এটুকু বোঝা যাচ্ছিল। আমি নম্বরগুলি থেকে কিছু উদ্ধার করার চেষ্টা করলাম না। তবে মনে হচ্ছিল, বাক্যটাতে আটটি শব্দই থাকবে। আমার কোন বন্ধুই এটা করেছিল। রহস্যজনক কিছুই মনে হচ্ছিল না আমার। তবে ম্যাপটা বেশ অদ্ভুত ছিল। একটা আঁকাবাঁকা রাস্তা, একটা বাড়ির পাশে একটা গাছ, দুদিকে ভাগ হয়ে যাওয়া একটা নদী, ব্রিজ, একটা ছোট পাহাড় কিম্বা ঢিবি, একটা গুহা। ছবিটার একদিকে কম্পাস এঁকে উত্তর- দক্ষিন দিকও বোঝানো ছিল। রাস্তার পাশে পাহাড়টার উল্টোদিকে (আমার মনে হচ্ছিল, শেষ প্রান্তে আর একটা পাহাড় ছিল) একটা তীর চিহ্ন দিয়ে আম্পুরদানের একটা গ্রামে যাওয়ার রাস্তা আঁকা ছিল।

রাতে, আমি যখন খাবার বানাচ্ছিলাম, আমার হঠাৎ মনে হলো, এটা এনরিকের কাজ। আমি কল্পনা করার চেষ্টা করলাম যে ও একটা ওয়াইনের গ্লাস হাতে নিয়ে পার্টিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমার বন্ধুদের (ওদের মধ্যেই কেউ একজন এখানকার ঠিকানা ওকে দিয়েছে) সঙ্গে কথা বলছে, সবার সঙ্গে যেচে কথা বলছে, আমার উপন্যাসটার সম্বন্ধে খারাপ কথাই বলছে সবাইকে, জোরে জোরে জিজ্ঞেস করে জানতে চাইছে যে আমি আদৌ পার্টিতে আসব কিনা! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আমার খুব রাগ হলো ওর ওপর। অনেক পুরনো হলেও ‘হোয়াইট রোপ’ ম্যাগাজিন থেকে বাদ যাওয়ার কথাটা আবার মনে পড়ল।

এক সপ্তাহ বাদে আমি আবার ওরকম একটা চিঠি পেলাম। বই প্রকাশের পার্টির কার্ডের (আমার মনে হয় অনেকগুলো কার্ড ও জোগাড় করেছিল)ওপরেই ছিল সেটাও। কিন্তু একটু আলাদা ছিল এবারের চিঠিটা। আমার নামের নীচে মিগেল এরনান্দের সুখ আর কাজের ওপর একটি উক্তি লেখা ছিল। উল্টোদিকে ঐ নম্বরগুলিই লেখা ছিল আর একটি অন্য ম্যাপ আঁকা ছিল। প্রথমে তো আমি ম্যাপটার মধ্যে আঁকা হিজিবিজি ছবি, বিস্ময়চিহ্ন, কাটাকুটি আর ডট দেওয়া দাগগুলি দেখে প্রথমে কিছু বুঝতেই পারছিলাম না। বারবার দেখার পর এবং আগের কার্ডটার সঙ্গে কিছুক্ষন মেলানোর পর বুঝতে পারলাম, ওটা আগের কার্ডটার ম্যাপটারই পরের অংশ। একটা গুহার ম্যাপ আঁকা হয়েছে এখানে।

আমার মনে হলো, এইসব ইয়ার্কি ফাজলামো করার বয়স আমাদের আদৌ নেই। একদিন বিকেলে আমি ম্যাগাজিনের দোকান থেকে একটা ‘কোয়েশ্চন্স অ্যান্ড আন্সারস’ কিনলাম। কিন্তু ওর মধ্যে কোথাও এনরিকে মার্তিনের নাম দেখতে পেলাম না। দিন কয়েক পর আমি ব্যাপারটা ভুলেই গেলাম।

এরমধ্যে তিন- চার মাস কেটে গেল। এক রাতে আমি বাড়ির বাইরে একটা গাড়ি থামার আওয়াজ পেলাম। আমার মনে হলো কেউ হয়ত রাস্তা হারিয়ে ফেলে চলে এসেছে এখানে। আমি কুকুরটাকে নিয়ে বাইরে বের হলাম। গাড়িটা একটা ঝোপের কাছে দাঁড়িয়েছিল। এঞ্জিনটা চালানোই ছিল আর হেডলাইট জ্বলছিল। কিছুক্ষন ওভাবেই থাকল গাড়িটা। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে বোঝা যাচ্ছিল না যে গাড়ির ভেতর ক’জন আছে! কুকুরটা সঙ্গে থাকাতে আমি ভয় পাচ্ছিলাম না। কুকুরটা খুব জোরে চিৎকার করছিল আর আমার হাত থেকে ছুটে গিয়ে গাড়িটার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিছুক্ষণ পর গাড়ির এঞ্জিনটা বন্ধ হয়ে গেল, লাইটও নিভে গেল। তারপর গাড়ি থেকে যে নেমে এল, সেটা সত্যিই অবাক করার মতো। এনরিকে  মার্তিন! প্রথমেই ও আমাকে জিজ্ঞেস করল যে আমি ওর চিঠিগুলি পেয়েছি কিনা! আমি ওকে হ্যাঁ বলাতে ও আবার জিজ্ঞেস করল যে খামগুলি ঠিকঠাক ছিল কিনা। খামগুলি ঠিক ছিল বলার পর ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে সব কেমন চলছে? এনরিকে দূরে পাথরের একটা খাদানের আলোর দিকে তাকিয়ে বলল যে সমস্যায় আছে ও। আমি ওকে ভেতরে যাওয়ার কথা বললাম। কিন্তু ও আমার কথা কানে তুলল না। দূরে যে আলো জ্বলছিল আর লোকজন কথাবার্তা বলছিল, সেটার ব্যাপারে জানতে চাইল। আমি ওকে পাথরের খাদান সম্বন্ধে বললাম, এটাও বললাম যে বছরের একটা সময়ে যে কেন ওখানে রাত জেগে কাজ হয় সেটাও আমি বুঝতে পারি না। এনরিকেও বেশ অবাক হল। আমি ওকে আবার ভেতরে যেতে বললাম। কিন্তু ও নড়ল না। এমন ভাব করল যে আমার কথাটা ওর কানেই যায় নি। আমি তোমাকে বিরক্ত করতে চাইনা। আমার কুকুরটা একবার শুঁকে গেল ওকে। আমি ওকে আবার বললাম, ভেতরে চলো, ঘরে বসে মদ খাবো। না, না আমি অ্যালকোহল খাইনা একদম। আমি ভেবেছিলাম, তুমি সেদিন তোমার বই বেরনোর পার্টিতে যাবে! এনরিকে বলল। না, আমার যাওয়া হয়নি। কথাটা ওকে বলেই আমার মনে হলো যে এবার হয়তো ও আমার বইটা নিয়ে সমালোচনা শুরু করবে। কিন্তু ও আমাকে বলল যে ওর একটা জিনিস আমি সাবধানে রাখতে পারব কিনা! আমি তাকিয়ে দেখলাম ওর হাতে একটা প্যাকেট। প্যাকেটটাতে মনে হলো এ-ফোর কাগজ আছে কিছু। আমি মনে মনে ভাবলাম, এনরিকে নিশ্চয়ই আবার কবিতা লিখতে শুরু করেছে! ও আমার মনের কথাটা বোধহয় বুঝতে পেরেছিল। অদ্ভুত ভাবে হেসে বলল, না কবিতা না! ওরকমভাবে হাসতে আমি ওকে অনেকদিন দেখিনি। তাহলে কি ? আমি জিজ্ঞেস করাতে ও বলল, সেরকম কিছু নেই কাগজগুলিতে। তোমার পড়ার দরকার নেই। শুধু সাবধানে রেখে দিও। আমি ওকে ভেতরে যেতে বললাম। কিন্তু ও বলল, আমি আর তোমাকে বিরক্ত করতে চাইনা আর এখনই বেরিয়ে যেতে হবে আমাকে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে এখানকার ঠিকানাটা ও কি করে জানল! ও সেই চিলের বন্ধুটির কথা বলল যার জন্য হোয়াইট রোপের প্রথম সংখ্যাটা থেকে আমার কবিতা বাদ গিয়েছিল। আমি বেশ অবাক হয়েই গেলাম যে আমার ঠিকানাটা ও দিয়েছে এনরিকেকে। তোমাদের মধ্যে এখন আর যোগাযোগ নেই! এনরিকে জিজ্ঞেস করল আমাকে। আমি ওকে বললাম যে ওর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিন কোন যোগাযোগ নেই। যাহোক ওর জন্যই তোমার সঙ্গে দেখা হলো আমার। খুব ভালো লাগছে দেখা করতে পেরে, এনরিকে বলল। আমার ওকে বলা উচিত ছিল যে ওর সঙ্গে দেখা হয়ে আমারও ভালো লাগছে। কিন্তু আমি কোন কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। ঠিক আছে, বেরোচ্ছি আমি। এনরিকে বলল। খাদানের দিক থেকে হঠাৎ খুব চেঁচামিচি আর বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। এনরিকে খুব ঘাবড়ে গেল আওয়াজটা শুনে। আমি ওকে ঘাবড়াতে না করলাম। কিন্তু রাতে আমি কোনদিন বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনিনি আগে। চললাম আমি। এনরিকে বলল। আমি ওকে সাবধানে এসো বলতেই ও আমাকে বলল, তোমাকে একবার জড়িয়ে ধরবো? অবশ্যই, আমিই এগিয়ে গেলাম। ও আমাকে জিজ্ঞেস করল কুকুরটা কামড়াবে না কি? আমি ওকে বললাম যে এটা মেয়ে কুকুর আর কামড়ায় না কুকুরটা কাউকে।

আরও বছর দুয়েক ঐ গ্রামে থাকার সময় আমি এনরিকের কথাটা রেখেছিলাম। ওর প্যাকেটটা আমি আমার নিজের কাগজপত্র আর পুরনো ম্যাগাজিনের সঙ্গে যত্ন করে দড়ি আর সেলোটেপ দিয়ে বেঁধে রেখেছিলাম। এনরিকের খবর একদিন চিলের ঐ বন্ধুটির কাছ থেকে পেলাম, যার জন্য হোয়াইট রোপ থেকে আমার কবিতা বাদ গিয়েছিল। সেদিন সে আমাকে ঘটনাটার পেছনে তার ঠিক কি ভূমিকা ছিল সেটা বলছিল। আমার অবশ্য ঐ পুরনো ব্যাপারটা নিয়ে কোন উৎসাহ ছিল না আর! ঐসব কথা বলতে বলতেই ও এনরিকের কথা বলল। বারিও দে গারসিয়াতে পুরনো ফ্ল্যাটের কাছে যেখানে আমি আমার মেহিকান বান্ধবীকে নিয়ে বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম সেখানেই এনরিকে একটা বইয়ের দোকান দিয়েছিল। এনরিকে আর ওর বউয়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছে, ওরা দুজনে কেউই আর ‘কোয়েশ্চন্স অ্যান্ড আন্সারস’-এ লেখে না। সেই বন্ধুটি আরও বলল যে ওর প্রাক্তন স্ত্রী আবার এনরিকের বইয়ের দোকানেই কাজ করে। একসঙ্গে থাকে না ওরা, স্রেফ বন্ধু। ভদ্রমহিলার কোন কাজ ছিল না বলেই এনরিকে ওকে কাজে নিয়েছিল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে এনরিকের বইয়ের দোকান কেমন চলছে। বন্ধুটি বলল, ভালোই চলছে ওর দোকান, আগে যেখানে চাকরি করত সেখান থেকে বেশ ভালো টাকাকড়ি পেয়েছিল ও আর দোকানের পেছনে দুটো ছোট ছোট ঘরে থাকে ও। পরে আমি দেখেছিলাম যে ঘরগুলির পেছনে আবার একটা ছোট উঠোন আছে। ওখানে এনরিকে, জেরানিয়াম, লিলি এবং ফরগেট-মি -নট গাছ লাগিয়েছিল। দোকানটার সামনে দুটো দরজা আর একটা লোহার শাটার ছিল। প্রতিদিন রাতে এনরিকে শাটারটা নামিয়ে বিল্ডিঙের ভেতরে যাওয়ার একটা ছোট দরজায় তালা লাগাত। আমি সেই বন্ধুটির কাছ থেকে এনরিকের ঠিকানাটা ইচ্ছে করেই নিলাম না, ও এনরিকে লেখালিখি করছে কিনা সেটাও জানতে চাইলাম না। কয়েকদিন পরে আমি এনরিকের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। এবার অবশ্য ও চিঠিটাতে নিজের নাম লিখেছিল আর মাদ্রিদে (আমার মনে হয় মাদ্রিদ থেকে চিঠিটা লিখেছিল ও, তবে আমি নিশ্চিত না) সায়েন্স ফিকশন লেখকদের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গিয়েছিল ও, সেটা জানিয়েছিল চিঠিতে। ‘কোয়েশ্চন্স অ্যান্ড আন্সারস’-এর সাংবাদিক হিসেবে ও ঐ সম্মেলনে (আমার যতদূর মনে পড়ছে, ও সায়েন্স ফিকশন না লিখে এস এফ লিখেছিল) গিয়েছিল। বাকি চিঠিটা জুড়ে হাবিজাবি কথা লিখেছিল ও। একজন ফরাসি লেখকের কথা লিখেছিল, যার নামটা আমার ঠিক মনে আসছে না! তিনি নাকি বলেছিলাম, আমরা নাকি সবাই ভিনগ্রহের বাসিন্দা। আমরা বলতে তিনি পৃথিবীর সব প্রাণীদের কথাই বলেছিলেন এবং সবাই বন্দিদশাতেই আছি এখানে। এনরিকে আবার যুক্তি দিয়ে লিখেছিল যে কিভাবে ঐ ফরাসি লেখক তাঁর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু আমি খুব একটা কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। ও ‘ মগজ পুলিশ’-এর কথা লিখেছিল, ‘হাইপার টানেল’ সম্বন্ধেও কিছু একটা বুঝিয়েছিল কিন্তু ওর নিজের কবিতার মতোই ঘেঁটে দিয়েছিল সব। চিঠিটার শেষে একটা রহস্যময় লাইন লিখেছিল এনরিকে, ‘ যারা জানে তারাই বাঁচবে’। আর বিশেষ কিছু লেখা ছিলনা চিঠিটাতে। তারপর ওর কোন চিঠিও আর পাইনি আমি।

এরমধ্যে বার্সেলোনায় গিয়ে সেই চিলের বন্ধুটির সঙ্গে দেখা হলো আমার। একটা রেস্তোরাঁয় খেতে খেতে কোনো ভনিতা না করেই দুম করে সে খবরটা দিল আমাকে।

দু’ সপ্তাহ আগে মারা গিয়েছে এনরিকে। একদিন সকাল বেলায় ওর প্রাক্তন স্ত্রী মানে দোকানের কর্মচারী, দোকানে এসে দেখল যে তালা খোলা হয়নি। একটু অবাক হলেও খুব একটা কিছু মনে করেনি সে। কারন এনরিকে মাঝেমধ্যে ভেতরে ঘুমিয়ে থাকত। সে তার চাবি দিয়ে শাটার আর কাচের দরজাটা বাইরে থেকে খুলে সোজা ভেতরে চলে গিয়ে দেখল বেডরুমের কড়িকাঠ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে এনরিকে ঝুলে আছে। আতঙ্কে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল মহিলার। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দোকানের বাইরে এসে  দোকান বন্ধ করে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল সে। আমার মনে হয়, পুলিশের গাড়ি না আসা অবধি ওভাবেই সিঁড়িতে বসে বসে কাঁদছিল সে। পরে পুলিশের সঙ্গে ভেতরে গিয়ে দেখল, ওভাবেই ঝুলে আছে এনরিকের দেহ। পুলিশ যখন ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল, তখনই ও খেয়াল করল ঘরের সারা দেওয়ালে অগুন্তি সংখ্যা লেখা! ছোট- বড়, কোনটা স্টেন্সিল দিয়ে লেখা, কোনটা স্প্রে দিয়ে রঙ করা। আর এনরিকের চোখের দৃষ্টি ঐ সংখ্যাগুলির দিকেই স্থির হয়ে আছে। পুলিশ দেওয়ালের সংখ্যাগুলির (৬৫৯৯৮৩+ ৭৭৯৫১১- ৩৩৬৯২২, এই ধরনের দুর্বোধ্য সব যোগ- বিয়োগ) ছবি তুলল। এনরিকের প্রাক্তন স্ত্রীর মনে হল, এসব বোধহয় ধারের হিসেব। এনরিকের কিছু ধার ছিল বাজারে। কিন্তু সেটা খুব বেশি না।সেজন্য কেউ মরবে, সেটাও সম্ভব না। পুলিশ মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করল যে দেওয়ালের এই সংখ্যাগুলি সে আগের দিন দেখেছিল কিনা! ও প্রথমে না করল, পড়ে বলল যে বেশ কিছুদিন সে এই ঘরে ঢোকেই নি।

পুলিশ ভেতরের দরজাটা পরীক্ষা করে দেখল। ওটা ভেতর থেকে বন্ধই ছিল। দরজা ভাঙ্গারও কোন চিহ্ন পেলনা খুঁজে। ঘরের দুটো চাবির গোছা ছিল। একটা এনরিকের প্রাক্তন স্ত্রীর কাছেই থাকত, আর একটা ক্যাশ বাক্সের কাছে ছিল। ম্যাজিস্ট্রেট আসার পর এনরিকের দেহটা নামানো হলো। অটোপ্সি রিপোর্ট আসার পর সবকিছু খুব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আত্মহত্যা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মারা গিয়েছিল এনরিকে। বার্সেলোনায় ঘন ঘন যেসব আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, সেরকম একটা আত্মহত্যা!

আম্পুরদানে রাতের পর রাত জেগে আমি এনরিকের আত্মহত্যার কথা ভাবতাম। ওর মতো মানুষ, যে বাচ্চাকাচ্চা চাইত, এমনকি নিজের পেটে বাচ্চা বড় করবে, এমন কথাও ভাবত; সে যে আত্মহত্যা করতে পারে এটা ভাবতেই পারতাম না আমি! ওর প্রাক্তন স্ত্রী, মানে ঐ দোকানের কর্মচারী মহিলাটি যখন ওকে ঝুলতে দেখল, তখন কী অবস্থায় ছিল ও! জামাকাপড় পরা ছিল! পায়জামা! নাকি কিছুই ছিল না শরীরে! আমার মনে হচ্ছিল, এনরিকে বোধহয় এখনও ঝুলে আছে ঘরের মাঝখানে। সংখ্যাগুলি নিয়ে খুব একটা ঝামেলা নেই। আমি কল্পনা করলাম, রাত আটটায় দোকান বন্ধ করে দিয়ে সারা রাত ধরে                      এনরিকে দেওয়ালে ঐ সংখ্যাগুলি লিখছে। তারপর ভোর চারটের সময় ছাদের কড়িকাঠ থেকে গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়ছে। ভোরবেলাই মরে যাওয়ার খুব ভালো সময়। আমি ওর মৃত্যুর কয়েকটা কারন খুঁজে বের করেছিলাম। একটা কারন তো ওর শেষ চিঠিতেই ছিল। আত্মহত্যা করে ও নিজের গ্রহে ফিরে যেতে চেয়েছিল। আবার এমনও হতে পারে যে, কেউ হয়তো ওকে খুন করে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। তবে কোন যুক্তিই ধোপে টিঁকছিল না! আমার মনে আছে ওর সঙ্গে যখন শেষবার আমার দেখা হলো, তখন কেমন অদ্ভুত ব্যবহার করছিল ও! দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে!

এরপরে যখনই বার্সেলোনায় গেলাম, বন্ধুবান্ধবদের এনরিকের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। কেউই বিশেষ কিছু খেয়াল করেনি ওর মধ্যে। কাউকে কোন ম্যাপ কিম্বা কোন কাগজের প্যাকেটও দিয়ে যায়নি ও। তবে একটা ব্যাপারে কেউ ঠিক মতো কিছু বলতে পারছিল না। অনেকে বলছিল ও ‘কোয়েশ্চন্স অ্যান্ড আন্সারস’-এর সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিল। আবার অনেকে বলছিল, মারা যাওয়ার আগ অবধি ওখানে নিয়মিত লিখত ও!

একদিন বিকেলে বার্সেলোনায় কিছু কাজ মিটিয়ে সোজা চলে গেলাম ‘কোয়েশ্চন্স অ্যান্ড আন্সারস’- এর অফিসে। সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করলাম। আমি যদি ভাবতাম যে ধাপ্পাবাজ গোছের কেউ থাকবে ওখানে, তাহলে বেশ ভুল করতাম। অন্যান্য কাগজের সম্পাদকদের মতোই বেশ চালাক চতুর ছিলেন ‘কোয়েশ্চন্স অ্যান্ড আন্সারস’-এর সম্পাদক। কোন ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তা মনে হচ্ছিল ওনাকে দেখে। আমার কাছেই উনি শুনলেন যে, এনরিকে মারা গিয়েছে। শুনে উনি দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম যে এনরিকে ওনার কাগজে নিয়মিত লিখত কিনা! উনি না বললেন। আমি তারপর ওনাকে মাদ্রিদের সায়েন্স ফিকশন লেখকদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কথা জিজ্ঞেস করলাম। উনি আমাকে বললেন ওদের পত্রিকার তরফ থেকে কাউকে উনি ওখানে পাঠান নি। আর ‘কোয়েশ্চন্স অ্যান্ড আন্সারস’ যেহেতু তদন্ত নির্ভর পত্রিকা তাই ফিকশনের ব্যাপারে তাঁদের কোন উৎসাহ নেই। এনরিকে সায়েন্স ফিকশনের ভক্ত ছিল। নিজেই ঐ সম্মেলনে গিয়েছিল ও।

এনরিকের কথা বন্ধুবান্ধবরা ভুলে যাওয়ার আগে এবং ওর অনুপস্থিতিটা সবাই মেনে নেওয়ার আগে আমি ওর প্রাক্তন স্ত্রীর ফোন নম্বরটা একজনের কাছ থেকে জোগাড় করে একদিন ওনাকে ফোন করলাম। প্রথমে উনি ঠিক চিনতে পারছিলেন না আমাকে।

‘চিনতে পারছেন না আমাকে? আমি আর্তুরো বেলানো! আপনাদের ফ্ল্যাটে আমার মেহিকান বান্ধবীকে নিয়ে বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম!’

‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ! চিনতে পেরেছই’। উনি বললেন।

তারপর উনি চুপ করে থাকলেন। আমি ভাবলাম, ফোনের লাইন বোধহয় কেটে গিয়েছে।

‘আমার খুব খারাপ লাগল ঘটনাটা শুনে। এজন্যই আপনাকে ফোন করলাম আমি। কি হয়েছিল বলুন তো!’

‘এনরিকে আপনার বই প্রকাশের পার্টিতে গিয়েছিল।’

‘ হুম, জানি সেটা।’

‘ও আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল।’

‘পরে দেখা হয়েছিল আমাদের।’

‘আমি বুঝতাম না, কেন যে ও আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইত!’

‘আমিও সেটা জানতে চাই।’

‘অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে! তাই না!’

‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়।’

তারপর ওনার সঙ্গে অল্পকিছু কথা হলো। সবকিছু কেমন চলছে, এসবই জানতে চাইলাম। তারপর আমার খুচরো পয়সা ফুরিয়ে গেল (আমি জিরোনার একটা ফোন বুথ থেকে কথা বলছিলাম), আমি আর ফোন করতে পারলাম না ওনাকে।

কয়েকমাস পর আমি আম্পুরদানের বাড়িটা ছেড়ে দেব ঠিক করলাম। বেড়ালগুলোকে প্রতিবেশীদের দিয়ে দিলাম আর কুকুরটাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবলাম। যেদিন যাব, তার আগের রাতে আমি এনরিকের প্যাকেটটা খুললাম। আমি ভেবেছিলাম যে প্যাকেটটার ভেতর হয়ত অনেকগুলো ম্যাপ থাকবে, যার মধ্যে অনেক আঁকিবুঁকি, সংখ্যা লেখা থাকবে। সেগুলো থেকে হয়তো এনরিকের মারা যাওয়ার কারনটা বোঝা যাবে। কিন্তু প্যাকেট খুলে সেসব কিছুই পেলাম না! পঞ্চাশটা এ- ফোর কাগজ ভালো করে বাঁধাই করা। কোন ম্যাপ, কোড নম্বর কোনও কিছু নেই। শুধু কবিতা! মিগুয়েল এরনান্দেখের স্টাইলে লেখা কবিতা। কিছু কবিতা আবার লিওন ফেলিপে, গাব্রিয়েল চেলায়ার মতো। সেই রাতে আমি আর ঘুমোতে পারলাম না। আমি বুঝতে পারছিলাম, এবার আমাকে পালিয়ে বেড়াতে হবে।