অর্চনা পূজারী

অর্চনা পূজারী  |  জন্ম ১৯৬১

১৯৬১ সালে অসমের জোরহাট জেলায় জন্ম। গুয়াহাটির আর্যবিদ্যাপীঠ কলেজের অসমিয়া বিভাগের শিক্ষয়িত্রী। প্রকাশিত কবিতার বই যথাক্রমে ‘উপলদ্ধির অভিজ্ঞান’, ‘জোনাকত জিলীর মাত’, ‘পানীপচার পানীত কাগজর নাও’, ‘চেতারত ইমন রাগর ধেমালি’ ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি।

ভাষান্তর | বাসুদেব দাস

 

নরকের সমীকরণ

নরকের বুকে স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায় সবাই
নিজেই নিরাভরণ করে শরীর এবং আত্মা
স্বর্গের মতো সেখানে নেই দ্বার রক্ষক
আর শৃঙ্খলিত জীবনের কর্ম-কাণ্ড
হাজার দুয়ার অতিক্রম করে
স্বর্গারোহী যুধিষ্ঠিরও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল
নরকের স্বপ্নের বাগিচা
অপমান আর যন্ত্রণার সারবান ক্ষেত্র
ভাষার শ্লীলতা এবং পোশাকের শালীনতা
তাও দেখার দরকার নেই।এটা নরক
স্বর্গের বাটখারায় স্থান না পাওয়া দেবতা,দানব,কিন্নর
প্রত্যেকেরই প্রিয় আশ্রয়
এখান থেকে কাউকে বিতরণ করা হয় না
হত্যা, লুণ্ঠন, বেশ্যামি, চাতুকারি সমস্তই সুলভ
সমস্ত আইন নিষিদ্ধ করা আছে এখানে
আশ্চর্য এই জায়গা, প্রশ্নেরও কোনো অবকাশ নেই
বন্দুক-বারুদে পৃথিবীটা ছাই করে এসেছ
তবু তুমি এখানে নির্ভয়ে থাকতে পার
প্রিয়জনকে হেনেছ, পিতা-মাতাকে হত্যা করেছ
সন্নিপাত জ্বরে সন্তান
নিষ্ঠুর সেই সত্যও ধন্য ধন্য এখানে
আত্মহত্যার সমীকরণ ও সমাধা হয়
শকুনগুলির অস্বস্তিকর ধপধপানিতে
পুত্র-কন্যার জ্যামিতিক হিসেবের তারতম্যে
গর্ভের মধ্যেই ভ্রূণের গলা টিপে ধরা হয়
অর্থপূর্ণ এবং অর্থহীনতার শূন্যতায়
পদপিষ্ট হয় মস্তিষ্কের পরিকল্পিত চিন্তা
নরকের দুঃখ এবং দুঃখের ফোঁপানি আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি করে
একবার যে এখানে পা রাখে সেই মাতাল হয়
সত্যি-মিথ্যার পার্থক্যগুলি ভুলে
অন্ধকার কূপে সবাই এসে দাঁড়ায়

দুগ্ধ-শঙ্খ

নোনা জল থেকে কাক ভেজা হয়ে
উঠে আসছে একটি দুগ্ধ শঙ্খ
তীরের বালিতে বসে রোদ পোহাবে
অপেক্ষা করবে শঙ্খের খোঁজ করা ছেলেদের জন্য

একটা কোলাহল হয়ে ছেলেরা আসবে
ওদের তুলে নেবে
কল্পতরু বলে ঝোলায় ভরবে
ধুবে, ধুয়ে চকচকে করবে
ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলি বন্ধ করে পালিশ মাখাবে
মেলায় নিয়ে গিয়ে দোকান দেবে
মহিলারাও মেলায় আসবে
ওদের শঙ্খ হাতে তুলে নেবে
নিখুঁত এক একটি শঙ্খ
পঞ্চমুখী না অষ্টমুখী
নেড়েচেড়ে তাই দেখবে

এক চোখ বুজে অন্যটায় গভীরে ঝুঁকে দেখবে
ঠেলে দেবে দমকা বাতাস
ঠোঁট দুটি সূঁচলো করে
শঙ্খ-নিনাদে আকাশের চন্দ্রাতপ
কাঁপিয়ে তুলবে
মাটির বিগ্রহ,পাথরের বিগ্রহ
সবাই জেগে উঠবে

অপ্সরার কণ্ঠে কী বাজে,কী বাজে
সবার চোখ কপালে উঠবে
ঠিক তখনই
লুইতের বুকের ছোটো একটা ঢেউ
সাগরে ভেসে উঠবে

ভায়োলিনের বাদক

ভায়োলিনটির বুকে হাজারজনের দুঃখ
বিলাপ করতে থাকে রাত থেকে সকাল
অহির ভৈরব
সেই দুঃখে কাতর হয়ে পড়ে ঘরের ভেতর
কেঁপে উঠে থরথর
আর নিজের অজান্তেই খসে পড়ে
ঘরের টই
সুযোগ বুঝে বাতাস
সেই সুর চুরি করে নিয়ে
মেলে ধরে মুক্ত আকাশে
শোকের নক্মা দেখে
রাতে ফোঁটা ফুলগুলি
একটা দুটো পাপড়ি খসে
নীচে আর জায়গা নেই
ভালোবাসা কেন কাঁদায়

কোমল শিশির
সেদিনের রাতটা কুশল বাদক
উৎসর্গ করে
ভায়োলিনটাকে

মুচি

আমার সঙ্গে আত্মীয়তা জুতোর
মুচি সেরকমই ভাবে
আমি জুতোয় রঙ মাখি,
মুখ দেখা যাওয়ার মতো করে পালিশ করি
ছিঁড়ে গেলে সেলাই করি
আঠা লাগাই, পেরেক মারি
‘সোল’ লাগাই
মজবুত, সুন্দর মেহগিনি কাঠের
কাঠমিস্ত্রি যেভাবে তৈরি করে
খাট, পালং, সোফা, বুককেস
মাঝে মধ্যে ভাবি
আমাদের দিন চলে গেছে
রঙ-বেরঙের জুতোয় বাজার ছেয়ে গেছে
কে মেরামতি করে
একবার পরে আবর্জনায় ছুঁড়ে দেয়
তবে, নতুন জুতোর চকমকানি আর কতদিন
দুদিন কাঁদ্দা-জল আর
বৃষ্টিতে ভিজলেই
ওদের অহঙ্কা্র ধুলোয় মিশোয়
তখন আমার খোঁজে
আমার কাছে এসে বসে
আমি মুচি
পায়ের জুতো, স্যাণ্ডেলগুলিকেই দেখি
কেউ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, কেউ বিদূষক
কেউ ছেলেমানুষ, কেউ সমজদার
কেউ চাকরিপ্রার্থী, কেউ অফিসার
বলের পেছনে ছুটে বেড়ানো
স্কুলের ছেলেটির জোতাজোড়া
রঙ ঘষতে অনেক সময় লাগে
তবে বিরক্তি লাগে না
জুতোজোড়া দূরে থাকা
আমার ছেলেটির স্পর্শ নিয়ে আসে

কাঠমিস্ত্রি ভাই মেহনতি আমরা দুজনেই
অন্যকে উজ্জ্বলতা দিয়ে
আমরা অন্ধকারে পড়ে থাকি

মৃত্যু

মানুষ চিরদিনের জন্য এই পৃথিবীতে থাকে না
আসার পথে আবার চলে যায়
ফেলে যায় নিজের সমস্ত কিছু
তাঁর প্রিয় পোশাক আশাক
তাঁর প্রিয় কলমটা
তাঁর শোনা গানগুলি,লেখা কথাগুলি
তাঁর প্রিয়তম পুরুষ অথবা নারী

চলে গেলেও থেকে যায় কিছু অনুভব
কারও হৃদয়ে তাঁর কথাগুলি থেকে যায়
কারও স্মৃতিকে কাতর করে
অহরহ ভাসতে থাকে তাঁর উপস্থিতি
বর্তমানে তিনি শরীরী নন
অমরত্বে তাঁর প্রয়োজন নেই

তাঁর একটা স্বপ্ন ছিল
একটা চারাগাছকে লালন করে বড়ো করার মতো
স্বপ্নটার পাখা গজিয়েছিলেন তিনি
সেটাও ফেলে রেখে একদিন চলে যান
যাবার আগে হয়তো কাউকে বলেন
স্বপ্নটাকে বাস্তবায়িত করার জন্য তোরা লেগে থাকবি
কিছু মানুষ হাত ধরে লক্ষ্যে চলে যায়
কিছু মানুষ তাঁর সঙ্গে সেখানেই সমাধিস্থ করে স্বপ্ন
কিছু মানুষ প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়

কাউকে দোষারূপ করার জন্য
অথবা বাহবা দেবার জন্য
তিনি তখন থাকেন না