দেবাশিস দাশ

বিদেশি কবির আলো-অন্ধকারে ।  অর্ণব সেন ।  উত্তর শিলালিপি

আলোচনা  ।  দেবাশিস দাশ

 

অনুবাদের আলো অন্ধকারে

অনুবাদ সম্পর্কে দু’ধরনের মত প্রচলিত আছে। প্রথমটির বক্তব্য হল, মূল ভাষার সৃষ্টিসৌন্দর্য কখনওই অন্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়, ফলে অনুবাদে হারিয়ে যায় মূল লেখার ফ্লেভার। দ্বিতীয় মন্তব্যটি হল এই যে, সেটুকুই সার্থক অনুবাদ, যা কিনা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর ঘটলেও অক্ষুণ্ণ থেকে যায় আর সেই সর্বজনীন রসের আস্বাদ থেকেই সর্বত্র পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে লেখাটি।

 

 

উদাহরণ হিসেবে আমরা লোরকার একটি কবিতা বেছে নিতে পারি। ‘বিদায়’ নামধারী এই কবিতাটি অনুবাদ করেছেন দুই সমকালীন কবি, অমিতাভ দাশগুপ্ত ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। প্রথমজনের ভাষায় কবিতার শুরুটা এই রকম : “মৃত্যু ঘনিয়ে এলে ব্যালকনি সরিয়ে দেবেন”। দ্বিতীয় অনুবাদক স্পষ্টতই বলেছেন, আক্ষরিক অনুবাদের পর পুরো লেখাটিকে বাংলা ভাষার শ্রুতি অনুসারে ঢেলে সাজাতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর রসজ্ঞ অনুবাদে আমরা পড়ি: “যদি মরে যাই জানলা খুলে রেখো”। মূল কবিতার অর্থবহ অনুবাদ করলে দাঁড়াত, “যদি মরে যাই, ব্যালকনি (অর্থাৎ ব্যালকনির দরজাটা) খুলে রেখো”…

সুনীলের অনুবাদটির কথা অনেকদিন পরে আমাদের মনে করিয়ে দিলেন অর্ণব সেন, তাঁর ‘বিদেশি কবির আলো-অন্ধকারে’ বইটির প্রাকভাষণে। অর্ণব সেনের অনুবাদে পুরো কবিতাটি পড়ে দেখা যাক: “যদি আমি মরি/ ঝোলানো বারান্দাটা খুলে রেখো।/ ছোট্ট ছেলেটা খাচ্ছে কমলালেবু / (আমার ঝোলানো বারান্দা থেকে আমি দেখতে পাচ্ছি।)/ চাষী ক্ষেতে বুনছে গম/ (আমি শুনতে পাচ্ছি আমার ঝোলানো বারান্দা থেকে)// যদি আমি মরি/ খুলে রেখো ঝোলানো বারান্দাটা।”

এবার, আরেকটি অতিপরিচিত ছোট কবিতার কথায় আসি। ফরাসি ভাষায় লেখা মূল কবিতাটির তিনটে আলাদা আলাদা অনুবাদ এ-মুহূর্তে আমাদের হাতে আছে। পাঠকের স্বাধীনতা নিয়ে পাশাপাশি পড়ে দেখা যেতেই পারে:

প্যারিস আট নাইট, জাক প্রেভের (অনুবাদ: চিন্ময় গুহ)

“অন্ধকারের ভেতর তিনটি দেশলাই কাঠি একটির পর একটি/ প্রথমটিতে তোমার সম্পূর্ণ মুখ দেখা গেল/ দ্বিতীয়টিতে তোমার চোখ/ তৃতীয়টিতে তোমার ঠোঁট/ আর সীমাহীন অন্ধকার সব কিছু মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য/ তোমার বুকে চেপে ধরে।”

রাতের পারী (অনুবাদ: পলাশ বরন পাল)

“তিনটে দেশলাইকাঠি একের পর এক জ্বলে উঠলো রাতের বুকে/ প্রথমটি তোমার গোটা মুখটুকু দেখার জন্য/ দ্বিতীয়টি তোমার দু’চোখ দেখার জন্য/ শেষটি তোমার ঠোঁটদুটি দেখার জন্য/ আর তারপর যখন তুমি বাঁধা পড়লে আমার বাহুবন্ধনে/ তখন এ সব কথা আমায় স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য রইল আদিগন্ত অন্ধকার।।”

রাতের প্যারি (অনুবাদ: অর্ণব সেন)

অন্ধকারে তিনটি দেশলাই কাঠি পরপর জালানো/ প্রথমটি তোমার গোটা মুখমণ্ডল দেখার জন্য/ দ্বিতীয়টি তোমার দুটি চোখ দেখার জন্য/ সব শেষেরটি তোমার অধরের জন্য// তারপর গাঢ় অন্ধকারে আমার সব কিছু স্মরণের লগ্ন/ আমি তোমাকে ধরে রেখেছি আমার বাহুর বন্ধনে।”

এই অনুবাদগুলি থেকে একথা স্পষ্ট হয় যে, ভাষাজ্ঞানই অনুবাদের জন্য যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন টার্গেট ভাষার সাবলীল দক্ষতা এবং সামান্য কবিকল্পনার রং মিশিয়ে তা পরিবেশনের বোধ।

একটি ছোট বইয়ের পরিসরে বিশ্বকবিতার ছিটেফোঁটাও ঠিকঠাক তুলে ধরা যায় না। যায় শুধু নিজের পুরনো অনূদিত বিভিন্ন কবির কবিতাকে গ্রন্থিত করে তোলা। সচেতন অনুবাদকের পারম্পর্যহীন একগুচ্ছ ইউরোপীয় কবিতা সুচারু মুদ্রণে অন্তর্ভুক্ত করেছে উত্তর শিলালিপি। উৎসর্গ করা হয়েছে: “বাংলা কবিতার সঙ্গে বিদেশি কবিতার সম্পর্কের সন্ধানীদের কথা মনে রেখে”। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে, প্রাগভাষণটি এবং বিক্ষিপ্ত ভাবে আট-দশটি কবিতার অনুবাদ বাদ দিলে অনেক ক্ষেত্রেই হতাশ হতে হয় আমাদের। বিশেষ করে বানানের যত্রতত্র ত্রুটি এবং বাক্য গঠনের বহুল খামতি প্রথম ধাক্কায় পীড়া দিতে পারে অপরিণত পাঠককে। যেমন, স্তেফান মালার্মে’র তিন পাতার গদ্যটি (অথবা গদ্যকবিতা) পড়তে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়েছে বারবার। এমন বাক্যগঠন অনুবাদের ক্ষেত্রে একেবারেই অভিপ্রেত নয়: “নিঃসন্দেহে এই স্বচ্ছ স্ফটিক আবরণকে যে করেছে একটা ভেতরের আয়নার মতো যা তাকে রক্ষা করছে প্রতিটি বিকেলের উজ্জ্বল হঠকারিতার হাত থেকে”। পাঠকের সময়ের মূল্য এইসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট বাধার সম্মুখীন হতে পারে।

জেরার্ড দ্য নার্ভালের মতো অনেকের কবিতাই প্রথাগত বাংলা ছন্দে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছেন অনুবাদক। প্রাচীন অর্থের খাতিরে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি ছন্দের তাগিদ মেটাতে ব্যবহার করা পুরনো দু’একটি শব্দ কানে লেগেছে ‘গথিক গান’ কবিতায়, যেমন ‘মোরা’। কবিতাটির শেষ পঙক্তিতে “পৃথিবীর ঈশ্বর হল সুখ” না লিখে ছন্দের সৌজন্য বজায় রাখতে লেখা যেতেই পারত : “সুখই ঈশ্বর পৃথিবীর”। বুদ্ধদেব বসুর কবিতাসংগ্রহ ৫, কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অন্য দেশের কবিতা’  যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা ইউরোপীয় আধুনিক কবিতার দীর্ঘ যাত্রাপথের ভূমিকা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কিন্তু যাঁরা নতুন প্রবেশ করতে চাইছেন কবিতার জগতে, তাঁদের কাছে ছোট এই বইটির গুরুত্ব থাকল। সঞ্জীব চৌধুরীর প্রচ্ছদে চার ফর্মার পেপারব্যাক বইটি হাতে ধরে নাড়াচাড়া করলেই এক বিরাট ভালোবাসার স্পর্শ খেলে যাবে শরীরে ও মনে। গ্রন্থ নির্মাণ: ভাষালিপি। উত্তরবঙ্গ থেকে এমন মনোলোভা বইপত্র উপহার দেওয়ার গুরুদায়িত্ব বহন করছে ‘উত্তর শিলালিপি’। এই কর্মকুশলতাকে অভিবাদন।

————————

বিদেশি কবির আলো-অন্ধকারে ।  অর্ণব সেন ।  উত্তর শিলালিপি