দীপ শেখর চক্রবর্তী

দীপ শেখর চক্রবর্তী

জন্ম ও বসবাস বারাসাতে। প্রেসিডেন্সি স্নাতকোত্তর। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত। মাঝে মাঝে নিরুদ্দেশ হন, অন্ধকারের লোভে। প্রিয় রং গাঢ় নীল।

ছায়া সম্পর্কে যতটুকু আমি জানি

কিছুদিন ছায়ার কথা না লেখা হলে আমি মোটেই ভালো থাকি না।
অযথা লোকের সাথে খিটমিট করি,
অথবা গুমরে গুমরে নিজেকে করে তুলি আস্ত একটা ব্যথার পুতুল।
ছায়া, যে গা এলিয়ে শুয়ে থাকে, ব্যস্ত হয় না।
চারপাশে কড়া রোদের জীবন যাকে দেখে ছিঃ ছিঃ করে-
বলে,এতটাও নিশ্চিত থাকা ভালো নয় মোটেই।
লোকে ওর কাছে আসে, কিছুক্ষণ দাঁড়ায়
বলে ওর মধ্যে এমন একটা মায়া আছে, ভয় লাগে।
আমারও এমন এক মায়ার কথা প্রতিদিন লিখে রাখতে ইচ্ছে হয়,
বিশেষত সবাই নিজস্ব ছায়াগুলো বাজারে চরা দামে বিক্রি করার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ায়,
আমি তখন দেখি আমার ছায়াটা আমাকে ছাড়িয়ে আরো আরো বড় হয়ে যাচ্ছে-
লম্বা হতে হতে সে ছুঁয়ে নিচ্ছে আরো আরো ছায়া

সমস্ত পেছনে তাকানো মানুষের ছায়া জুড়ে জুড়ে একটা অন্য পৃথিবীর জন্ম দিতে চেয়েছিলাম আমরা।
বলেছিলাম-
মানুষের মধ্যে যে আশ্চর্য সুন্দর শান্তি আছে,অন্ধকার আছে-
তা কেবল চড়া রোদে দাঁড়ালেই বোঝা যায়।

কবির অভিশাপ

সমস্ত সুরেলা পাখি একে একে গান শুনিয়ে উড়ে গেল, পালক খসিয়ে
তুমি এলে তোমার নীলাভ শরীরের মাঝে লাল টকটকে ঠোঁট
চোখের মণিতে দেখেছিলাম সে ঝড়
বালক বয়সে যাতে আম কুড়োতে যেতাম আমি
হাতের মধ্যে থেকে একে একে আঙুল বেছে নিয়ে বাজিয়েছি বাঁশি
অথবা বিরাট শঙ্খের মতো বুকে সমস্ত প্রাণবায়ু দিয়ে ফুঁ দিয়েছি যখুনি
সমুদ্রের গরজন শোনা গেছে
জেনো কত রাত নিদ্রাহীন আমি বৃষ্টির ভেতর থেকে দু’আঙুলে সরিয়ে নিয়েছি বালিকার চোখের জল
সূর্যের সমস্ত তাপ আমি সমস্ত শরীর দিয়ে শুষে টিমটিম করে জ্বলেছিলাম বাতি হয়ে
এক বৃদ্ধ কামিন যে আলোয় নাতনির মুখ দেখে
লাল মেঝে আমার ঘর ছেড়ে পথে পথে ভিক্ষে করে বেরালো
পায়ে তার উলের মন্ড
তার পিছু পিছু ভাতখেকো বিড়ালশাবক ডেকে যায়
সে ডাক কিশোরীর প্রেমে হেমন্তের প্রথম ব্যথা হয়ে আসে
বুকে তার ছাতিমের গন্ধটুকু লেগে থাকে
তোমাকে বলি বিশ্বাস করো শৈশবের দীঘির ভেতর ডুব দিয়ে আমি তুলে এনেছিলাম যাদুকরী হাড়
সে হাড় আমি কিশোরীর প্রেমিককে দিয়েছিলাম
বলেছিলাম সমস্ত ধ্বংসস্তুপের ভেতর থেকে তুমি খুঁজে নিয়ে এসো হরিণশাবক
অথবা দুয়েকটি আশ্চর্য ফড়িং
তুমি জলের কাছাকাছি নিয়ে এসো
তারপর আমার ভেঙে যাওয়া ঘর তুলে ধরো
সামান্য তুলসীমঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে সেই কিশোরীকে (এখন সে গৃহিনী)
বোলো তুমি
এ গাছের তলায় কবরে শুয়ে আছে ব্যর্থ কবি এক
পৃথিবীর দিকে যত জ্বলন্ত নক্ষত্র ধেয়ে আসে সে বুক পেতে সয়েছিল
সেই ক্ষতের ওপর বয়েছিল নদী
সে নদী দেখে চমৎকার হাততালি দিয়েছিল চকমকি আগুন যত আছে
নারীরা সিঁদুরের পাত্রগুলো একে একে ছুড়ে ফেলেছিল সেই উন্মত্ত প্রবাহে
অথচ একদিন সাঁওতালশিশু এক নগ্ন পায়ে ভীড় থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেছিল তাকে
‘এখনো কী ব্যথা পাও?’
সে শুনে কবির সমস্ত জল শুকিয়ে গেলো
বিরাট গর্তগুলো নিয়ে নানা গ্রহে ঘুরে বেরিয়েছে সে ভিক্ষুক হয়ে
অবশেষে একদিন তুলসীতলায় এসে শুয়েছিল
তার ওপর গড়ে উঠেছিল গ্রাম
যে গ্রামে পৃথিবীর সমস্ত পরাজিত প্রেমিক প্রেমিকারা এসে ঘর বাঁধে
আর এক অদৃশ্য কবির প্রেত পাহাড়ায় থাকে
ঘুরে ঘুরে বাজায় হাড়ের বাঁশি
অশান্তির আগুন এলে চোখে চোখ রেখে বলে
খবরদার পোড়াতে এলে ওদের ওই আগুনেই তবে পুড়িয়ে মারব তোকে।

আমাদের ফেলে আসা খেলাটা

চৈত্রের জানলা দিয়ে দেখি হাওয়া খেলছে নারকেল-যুবতীদের এলোমেলো চুল নিয়ে,
আমার কাছেও এলো,বললো-
‘খেলাটা কিন্তু বাকি রয়ে গেছে’।
পথেঘাটে একটা ফাঁকা জমি পেলে আমারও মনে হয় এ কথা-
কোথাও একটা খেলা ছেড়ে ঠিক চলে এসেছি
তাই কিছুতেই আর মন বসাতে পারি না।
নারকেল যুবতীরা একে একে আকাশের ব্যালকনিতে বুক চেপে দাঁড়ায়
‘ওই শুনতে পাচ্ছো? ওই যে…’
কী শুনবো? সারাদিন চোখ বুজে আকাশেতে কান পেতে থাকি।
শুনি, কে একজন সিড়ি বেয়ে বেয়ে উপরে উঠছে, হাতে জলভর্তি বালতি,
উপচে পড়ছে আর আমাদের এখানে কি বৃষ্টি…
তবে ছেলেবেলার মতো বৃষ্টি আর অত ভালো লাগে না।
বরং একটা স্থির জলের দীঘির কাছে বসি, আঙুল ডোবাই
একটা তরঙ্গ ওঠে বলেই এখনো বেঁচে আছি।
প্রতিরাতে একটু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলি-
ঠকে ঠকে বুড়ো হয়ে গেলাম, তবু যে কেন শিক্ষা হয়না…
আমরা যারা, এই আকাশ, পাখি,তারা, পাতা-এদের
শিক্ষা হয়নি বলেই তাদের কলমটা আর কলম নেই,
বিকেলের মাঠে ফেলে আসা খেলাটা জন্যে বন্ধুদলের ডাক হয়ে গেছে।