ফেসবুক কি কবিতাকে খুন করছে? কী বলছেন কবিরা

আমি কয়েকবছর আগে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলাম ফেসবুক কবিদের সেন্ট হেলেনা হতে চলেছে। কিন্তু হয়নি। তার বদলে লিটল ম্যাগাজিন যা ছিল বাংলা ভাষায় ‘ফেনমেনন’ তারই মৃত্যুঘণ্টা শুনতে পাচ্ছি! আমরা কী পারব কাদায় বসে যাওয়া রথের চাকো তুলে আনতে? কালকে চাইলেই আমি আমার হাত থেকে মোবাইল ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারব না। টেকনোলজির কাছে, ইন্টারনেটের কাছে আমি অর্ধেক কৃতজ্ঞ, ওটা না থাকলে আমি মেক্সিকো থেকে মণিপুর, জাপান থেকে জঙ্গলমহল, ক্যারিবিয়ান থেকে কোচবিহারের নতুন কবিদের আবিষ্কার করতে পারতাম না। ইওরোপ আবিষ্কার করতে আমরা দু’শো বছর নিয়েছি, ইন্টারনেট থাকলে দু’বছর লাগত।

আর একটা অর্ধেক হল স্মৃতি। সেই স্মৃতির নাম বই। আমি উমবের্তো একোর সঙ্গে একমত– ‘দিস ইজ নট দ্য এন্ড অব দ্য বুক’। ফেসবুক মরে যাবে, বই মরবে না।

সুবোধ সরকার
সম্পাদক: ভাষানগর

ফেসবুক কবিতাকে ঋদ্ধ করে না

শ্যামলকান্তি দাশ: ফেসবুক একেবারেই কবিতা প্রকাশের জায়গা নয়। অনেক ভালো ভালো কবি ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করেন, তাতে বাংলা কবিতার কতটা উপকার হয় আমি জানি না। ফেসবুকে কবিতা পোস্ট একটা তাৎক্ষণিক ব্যাপার! এটা গ্রহণযোগ্য বলে আমার মনে হয় না। ফেসবুকে অনেকে নতুন কবিতা পোস্ট করেন। অনেক সুযোগসন্ধানী আছেন, যারা সেই কবিতাগুলোকে অপহরণ করেন। বিশেষ করে অপ্রকাশিত কবিতার ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়। আমি নিজে এমন ঘটনা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। ফেসবুকে পোস্ট ঘিরে অনেক সময় কুৎসিত প্রসঙ্গের অবতারণা হয়। সেগুলোও আমাদের মনকে ব্যথিত করে, পীড়িত করে, বিরক্ত করে।

ফেসবুকে কবিতা পোস্ট একেবারে অনভিপ্রেত ব্যাপার। অনেক সময় সেই ব্যাপারের মধ্যে আমরা ঢুকে পড়ি। আমার কবিতা অনেকে ফেসবুকে পোস্ট করেন, মাঝেমধ্যে দেখি। সেটাও আমার কাছে পীড়াদায়ক, অত্যন্ত কষ্টের। ফেসবুক কবিতা প্রকাশের জায়গা হতে পারে না। কোনও কোনও সময় ফেসবুকে দু-একটা অত্যুজ্জ্বল লাইন চোখে পড়ে ঠিকই! তবু আমার মনে হয়, ফেসবুক কবিতাকে ঋদ্ধ করে না, কবির মনকে ঐশ্বর্যশালী করে না।

ডিজিটাল অ্যাডিকশন মানুষের কবিত্ব শক্তির মারাত্মক ক্ষতি করে

রণজিৎ দাশ: আমার কাছে কথাটা ফেসবুকের নয়, কথাটা ডিজিটাল অ্যাডিকশনের। সোশ্যাল মিডিয়ার নেশায় সারাক্ষণ অস্থির আচ্ছন্ন হয়ে থাকার এই মারণরোগে আজ সারা পৃথিবীর তরুণ প্রজন্ম আক্রান্ত। আমি বলবো, এই ডিজিটাল অ্যাডিকশন মানুষের কবিত্ব শক্তির মারাত্মক ক্ষতি করে নানা ভাবে। প্রথমত, এই অ্যাডিকশন একজন কবির creative solitude-কে ক্ষতি করে, যা একেবারে কবিত্বের মর্মমূলে আঘাত। কারণ কবির মূল শক্তি প্রকৃত বাস্তবতার গভীর সঙ্গ ও জ্ঞান, কিন্তু ডিজিটাল তাকে ভার্চুয়াল বাস্তবতায় আচ্ছন্ন করে, তার চেতনার পর্দায় কম্পিউটার স্ক্রিনের মতো প্রচ্ছন্ন কাঁপন ধরে যায়। ফলে সৃজনশীল নৈঃশব্দ্যের ভিতরে তার নিষ্কম্প চিন্তা ও অনুধ্যানের ক্ষমতা লুপ্ত হতে থাকে। অথচ এই চিন্তা ও অনুধ্যান ছাড়া তো গভীর কবিতা হয় না।

তোমাদের কাছে আজ হাস্যকর মনে হবে, কিন্তু আমার কাছে একজন কবির চিরায়ত মেটাফর হল নির্জন গুহায় ধ্যানরত একজন ঋষি, যিনি ঈশ্বরের নয়, মানবহৃদয়ের সাধনা করেন। দ্বিতীয়ত, কম্পিউটার চলে binary logic-এ এবং single vision-এ, অন্যদিকে কবিত্বের মূল শক্তিই হল তার intuitive magic এবং multiple vision, ফলে কম্পিউটারের প্রভাবে কবি তার এই শক্তি দুটি হারাতে থাকে। তৃতীয়ত, ভাষার deep structure রক্ষা করেন কবিরা, কিন্তু যে-মুহূর্তে কবি ভার্চুয়ালের টানে প্রকৃত বাস্তবতার কাছ থেকে দূরে সরে যান, সে-মুহূর্তেই তার ভাষার deep structure-এর জ্ঞান কমে যেতে থাকে। এবং চতুর্থত, এই ভার্চুয়ালের ছলনা ও তাড়নার কুপ্রভাবে কবির আবেগের জগৎটা, তার প্রকৃত অনুভবের জগৎটা ধীরে ধীরে বন্ধ্যা হয়ে যায়। একজন কবির এর চেয়ে বড় সর্বনাশ আর কী হতে পারে?

ফেসবুকের মধ্যমেই আমি অনেক তরুণ কবির লেখা পড়েছি

সুধীর দত্ত: ফেসবুকে সিরিয়াস পাঠক থাকে না। আবার অনেকে আছে যারা কবিতা বুঝতে চায়। ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করতে আপত্তির তো কিছু নেই! এটা একটা বড় মাধ্যম। ফলে অনেকের কাছে কবিতাটা পৌঁছয়। আমার মতে, এই মাধ্যম তরুণ কবির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাকে অনেকে কবিতা পোস্ট করতে অনুরোধ করেন। আমি নিজেও ফেসবুকে কবিতা প্রকাশ করি। কিছুদিন যদি বন্ধ রাখি তাহলে অনেকে আবার মেসেজ করে কবিতা পোস্ট করতে বলেন। এটা আমার ভালোই লাগে। কেউ কেউ আমাকে বলেছেন, আপনার এই কবিতাটা পড়ার জন্যই আমার ফেসবুকে আসা সার্থক হয়েছে। এমনও পাঠাক আছে! ধরো, একটা কবিতা পোস্ট করলাম সেটা একশ জন লাইক করল। তার মধ্যে তিনজন তো ভাল পাঠক আছে। তাই বা কম কী? আমার কবিতার তলায় অনেকে মন্তব্য করেন। কিন্তু সেইসব মতামতের দ্বারা আমি প্রভাবিত হই না কখনও। ফেসবুকের মধ্যমেই আমি অনেক তরুণ কবির লেখা পড়েছি। সেটাও একটা পজেটিভ দিক।

কবিতার বিচার চটজলদি হয় না

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়: কাগজ কি কবিতা লেখার মাধ্যম? কাগজ আবিষ্কার হওয়ার আগেও কবিতা লেখা হত। ভুর্জপত্রে কবিতা লেখা হয়েছে, তালপাতায় কবিতা লেখা হয়েছে, মনে মনে কবিতা লেখা হয়েছে। তারপর কাউকে সেই কবিতা শোনানো হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এভাবেই কবিতা ছড়িয়ে পড়েছে। বেদ, রামায়ণ, মহাভারত মুখ থেকে মুখে ঘুরে বেড়িয়েছে। তারপরে কাগজ এসেছে। কাগজে কবিতা লেখা হয়েছে। এরপর ছাপাখানাও এসেছে। আমরা মুদ্রণের শিখরে পৌঁছেছি। আজকাল আবার মুদ্রণও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চা ছেলেমেয়ারা কলমে লিখতে ভুলে যাচ্ছে। তারা মোবাইলে টাইপ করে কবিতা লিখছে। আগামী দিনে হয়ত আরও নতুন কোনও মাধ্যম আসবে, যেখানে কবিতা লেখা হবে।

একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, ফেসবুকে কবিতার প্রশংসা বা নিন্দা তাৎক্ষণিক। আর কবিতার সঙ্গে তাৎক্ষনিকতার অঙ্গাঙ্গি যোগাযোগ নেই। যদিও তাৎক্ষণিক কবিতা লেখা হয়েছে। কিন্তু কবিতা বলতে আমরা কালজয়ী কবিতাই বুঝি। তাই বলাই বাহুল্য, কবিতার বিচার চটজলদি হয় না। ফেসবুকে যা অনেকে হামেসাই করে থাকেন। ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করা নিয়ে আমার কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু বিচারের ক্ষেত্রে নিখাদ প্রশংসা বা খানিক নিন্দা– এই নিয়ে একটা বিড়াম্বনা তৈরি হয়। আমারা বাঙালিরা সামনাসামনি প্রশংসা করতেই ভালোবাসি, আড়ালে নিন্দা। ফলে গঠনমূলক সমালোচনা পাওয়া যায় না। এটুকু বাদ দিলে, ফেসবুক কবিতার একটা মাধ্যম হতেই পারে, যেমন তালপাতা, ভুর্জপত্র, কাগজে কবিতা লেখা হয়েছে একটা সময়।

রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করতেন

সৌরভ চন্দ্র: কবিতা লেখার জন্য সাদা খাতা আর একটি কলমের প্রয়োজন। আগে কবিতা প্রকাশের মাধ্যম ছিল প্রিন্ট মিডিয়া। এখন ফেসবুক হয়ে উঠেছে তরুণ কবিদের সদ্য লেখা কবিতা প্রকাশের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। ইদানীং অনেকেই কবিতা লিখে চটজলদি পোষ্ট করেন ফেসবুকে এবং কবিতাটির পক্ষে বিপক্ষে বেশ কিছু কমেন্ট তৎক্ষণাৎ পেয়ে থাকেন। আমরা যাদি ট্রেনে চড়ার ক্ষেত্রে তৎকাল টিকিট কাটতে পারি, আমরা যদি রোগীর চিকিৎসার জন্য আপতকালীন বিভাগ করতে পারি, তাহলে আমার সদ্য লেখা কবিতাটি কেমন হয়েছে সেটা জানার জন্য ফেসবুকে পোস্ট করব না কেন? এর মধ্যে আমি খারাপ কিছু দেখি না। যদিও কবি-কবিতা ও পাঠকের সম্পর্ক চিরকালীন। তাই শুধুমাত্র ফেসবুকের মধ্যে দিয়ে সেই সম্পর্কের সুবিচার হয় না। তবু নতুনকে স্বীকার করতে হবে, তাকে স্বাগত জানাতে হবে এবং সঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

নানা সমস্যা আছে। মূল সমস্যা হল, ফেসবুকে কোনও এডিটর নেই। কবিতা পোস্ট থেকে শুরু করে মন্তব্য– সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যেই একটা চরম স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা সব ক্ষেত্রে ভালো কিনা আমার জানা নেই। কিছু ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই খারাপ। তবে, দুরন্ত এক্সপ্রেসের মতো ছুটে-চলা এই সময়ে আমার কবিতাকে খুব দ্রুত অনেকের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য আমি অবশ্যই ফেসবুককে গুরুত্ব দেব। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করতেন!

 

সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন: অরুণাভ রাহারায়