পঞ্চ কবির কবিতা

শিবাশিস মুখোপাধ্যায়শ্বেতা চক্রবর্তী, শ্রীজাত, বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, অংশুমান কর… এই পাঁচজন কবির লেখা আমি পড়ে আসছি কুড়ি বছর ধরে। তাঁরা কীভাবে বড় হয়ে উঠলেন, কীভাবে তাঁদের ভাষা পাল্টে গেল, কে কীভাবে গদ্য ছেড়ে ছন্দে ঢুকলেন, কে কোন বিশ্বাসে স্থিত হলেন, কে রাত্রে ঘুমোতে পারছেন না, কে রোমান্টিক, কে প্রেম থেকে প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠলেন– এসব দেখতে দেখতে দু’দশক পার হয়ে এলাম। আমাদের পরবর্তী সময়ে বাংলা কবিতা অনেক গভীর হয়েছে, অনেক স্মার্ট হয়েছে, অনেক জনপ্রিয় হয়েছে, অনেক ছন্দোময় হয়েছে, অনেক গদ্যময় হয়েছে। বাংলা কবিতা থেমে থাকেনি।

ফেসবুকের যুগ এখন, সকালে লিখে বিকেলে বিখ্যাত হওয়া যায়। এটা যেরকম একটা প্রাপ্তি তেমনিই এটা চ্যালেঞ্জ। এই পাঁচজন কবি যেমন আমাকে এগিয়ে নিয়ে যান নতুন নতুন দিগন্তের দিকে তেমনি বিপরীত মেরুর আরো আরো পাঁচজন দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার ওপারে আমাকে আমূল কাঁপিয়ে দেবেন বলে। বিভিন্ন মত ও বিশ্বাসের মানুষ হয়েও তাঁরা একটি জায়গায় জায়মান, তাঁরা একটি জায়গায় যুগান্তকে অতিক্রম করে যান– তাঁরা কবি।

কবিতা লিখি বলেই এতগুলো সমগ্রকে, এত বিভিন্নতাকে সহ্য করতে পারি, ভালবাসতে পারি। এখানে কোনও ‘আদার’ নেই, কোনও ‘অপর’ নেই, আছে শুধু কবিতা– তিনি আমাদের জননী, আমাদের জন্য রান্নায় বসবেন, আমরা মায়ের জন্য অরণি কাঠ আনতে বেরিয়েছি।

সুবোধ সরকার, সম্পাদক: ভাষানগর

 

    • শিবাশিস মুখোপাধ্যায়,
    • শ্বেতা চক্রবর্তী,
    • শ্রীজাত,
    • বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়,
    • অংশুমান কর
  • …এই পাঁচজন কবির লেখা আমি পড়ে আসছি কুড়ি বছর ধরে। তাঁরা কীভাবে বড় হয়ে উঠলেন, কীভাবে তাঁদের ভাষা পাল্টে গেল, কে কীভাবে গদ্য ছেড়ে ছন্দে ঢুকলেন, কে কোন বিশ্বাসে স্থিত হলেন, কে রাত্রে ঘুমোতে পারছেন না, কে রোমান্টিক, কে প্রেম থেকে

শিবাশিস মুখোপাধ্যায়

মালঞ্চ

আমার চরিত্র আর আমি চরিত্রের

দুজনে দুজনকে নিয়ে বেঁচেবর্তে আছি,

যতই মধুর গামলা ধরি ওর মুখে

অন্যের বাগান দেখলে চরিত্র মৌমাছি।

 

অন্যের বাগানে ফুল, সেই ফুলে ব’সে

ডুবে ডুবে জল খায়, টের পায় না মালি,

খাওয়া হলে মুখ মুছে উড়ে চলে এলে

গাছেরা হাওয়ায় কেঁপে দেয় হাততালি।

 

কেউ বলে ও মৌমাছি, কেউ বলে ও চোর;

গান বলে গুনগুনিয়ে— ঘরেতে ভ্রমর !

 
 

শ্বেতা চক্রবর্তী

অমৃত

যুবকটি একটু একটু করে খুলে দিচ্ছে

নারীটির খোঁপা,

মুক্তোলাগা কাঁটাগুলি,

হালকা জালের বেড়িটি,

চুলের সাপ ও সাধনা।

 

নারীটি কাতর,

নিধিরাম পদ্মে অকালে বসেছে ভ্রমর,

কালো ও কঠিন, উড়ন্তবায়, শব্দগন্ধী,

শ্যামল-কানাই ভ্রমর…

 

আকাশের মেঘও কালো,

বৃষ্টি নামছে কোথাও,

এদিকে কীর্তন ছাইছে…

কোলের কৃষ্ণকে শিশু নয়, পুরুষ নয়, প্রেমিক নয়, বন্ধু নয়,

 

ভেসে যাওয়া রূপ বলে ভাবতে ভাবতে

 

ঈষৎ বয়স্ক নারী ঝাঁপ দেবে বলে দাঁড়িয়েছে;

 

খাদের কিনারে শেষ আলো,

নিচে ঋতুবতী নদীটি,

সন্ধ্যাবেলার দিকে বনের ঝিঁঝির ডাক, রক্তাক্ত, একটানা,

পৃথিবীর শেষ শ্রেষ্ঠ কাব্যের মতো

আলুলায়িত অমৃত।

 

 

শ্রীজাত

লাগাম

সহজ সরল ভাবেই তোমার হাত ধরতে চাওয়া

অথচ দিক এড়িয়ে গেল পশ্চিমা কোন হাওয়া,

সে কি তোমার বাড়ি চেনে?

 

একটা দুটো কথার ফাঁকে ধরতে চাওয়া হাতে

দেখছি অনেক না ভাঙা রাগ জমেছে তল্লাটে

তুমি উঠেছ শেষ ট্রেনে।

 

এখন কোনও অহমিকার নিরীহ ফুলদানি

যদি নেহাত উপহারের অছিলাতেই আনি

বলো, ফিরিয়ে দেবে তাকে?

 

মফস্বলের একলা কোনও সন্ধেবেলার নেশা

এক দু’মুঠো ভাতের আশায় মিথ্যে কলম পেষা

তেমন ফুল ধরেনি শাখে।

 

তবুও আজ বৃষ্টি ব’লে ভিজতে এসে দেখি

শালিখরা সব ভাবছে এমন মরসুমে করবে কী

তাদের ডানায় পারমিতা

 

তোমার থেকে দূর যেতে হয় এমন ভেজার ছলে

নাহলে এই লাগাম আমি শুকনো মফস্বলে

ভীষণ আলগা করে দিতাম…

 

 

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

সাজানো বাগান

যখন মাথায় টোপর দিয়ে ধর্ষকরা ‘বর’ সাজতে ব্যস্ত

ঘরে মঙ্গলঘট বসিয়ে মাতাহারিরা সাজতে চায় ‘গৃহলক্ষ্মী’

একটা জাল কেটে অন্য জালে ঢুকতে ঢুকতে

বাচ্চারা ‘স্পাইডারম্যান’ সেজে ঘুরছে…

যখন ট্রাক-ভর্তি লুম্পেনরা ‘সুবিচার’ সেজে

আধলা-ইট ছুড়ছে হাসপাতালে ঢুকে

আর সাংবাদিকরা ‘নিরপেক্ষ’ সেজে দেখিয়ে দিচ্ছে যে

ডাক্তাররাও ‘দেবতা’ সেজে মোবাইলে চ্যাট করছিল

মৃত্যুপথযাত্রীর বেডের পাশে …

যখন চিটফান্ডের টাকায় ডুবে থাকা বুদ্ধিজীবীরা

বিশ্বভ্রমণ সেরে এসে

যে-কোনও মিছিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ‘মানবতা’ সেজে

আর চটে কবিতার বই বিছিয়ে আমাকে-তোমাকে বসে পড়তে দেখে

সেজে উঠছে মাছের বাজারও…

যখন দেশের অর্ধেকটা খরায় জ্বলে যাচ্ছে বলে,

চোখের জল বৃষ্টি সাজতে লজ্জা পাচ্ছে

বাঘেদের ভয় করছে ‘ছিনাথ বহুরূপী’ সাজতে…

যখন ‘স্বাধীন’ সাজতে চাওয়া প্রতিটা প্রাণ

গলার বকলসের দাগ মুছতে চাইছে শুধু…

 

তখন

হাতে-পায়ে শিকল বেঁধে জাদুকর চঞ্চল লাহিড়ী গঙ্গায় ঝাঁপ দিলেন,

‘সুপারম্যান’ সেজে ভেসে উঠবেন বলে।

 

তলিয়ে গেলেন…

 

 

অংশুমান কর

সোজা কথা

মনে পড়ে পায়ে পা মিলিয়ে পাড়ার দিদিদের সাথে

কিতকিত খেলা।

মনে পড়ে স্কুলে যাওয়ার পথে

টুপুদির কানে কানে পুটুর পুটুর করে এমনভাবে বলা

প্রথম প্রেমের কথা, যেন আমরা দুই সই।

মনে পড়ে দিদিদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে চড়ুইভাতিতে

খিচুড়ি রান্না

আর পুজোর দিন সকাল সকাল উঠে সবাই মিলে

কাটতে বসা আপেল,  বাতাবি লেবু, কলা।

মনে পড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ছোড়দির ফ্রক পরে, লিপস্টিক মেখে

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার এদিক আর একবার ওদিক ঘুরে দেখা

আমারও শরীরে ফুটেছে কিনা সূর্যমুখী।

মনে পড়ে, মনে পড়ে আমার দিদিময় ছেলেবেলা

আর মেয়ে সাজবার হাজারো কৌশল…

এ গল্প তো কেবল আমার একার নয়

তাহলে কাদের আপনারা ‘গে’ বলে বিদ্রুপ করেন?

‘হিজড়ে’ বলে খিস্তিই বা দেন কাদের?

হিসেবের একচুল এদিক-ওদিক হলেই তো ভেঙে পড়ত দেওয়াল।

তখন আর ‘সোজা’ বলে আপনাদের গব্বো করা সাজত না।

 

শুনছেন, ও সোজা মানুষেরা,

অনেক তো হল, এবার বন্ধ করুন আমরা / ওরা।