হর্হে লুইস বর্হেস

হর্হে লুইস বর্হেস (১৮৯৯-১৯৮৬)

আর্জেন্টিনিয়ান গল্প লেখক, কবি, অনুবাদক, প্রবন্ধকার ও সমালোচক। স্প্যানিশ সাহিত্যের এক কীর্তিমান স্তম্ভ এবং একজন অবিসংবাদিত গল্পকার। সমালোচকেরা তাঁকে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে ফ্যান্টাসি ও ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রবর্তক বলে মনে করেন। বর্হেসের উল্লেখযোগ্য কিছু কাব্যগ্রন্থ হল Fervor de Buenos Aires (FERVOR OF BUENOS AIRES), Luna de enfrente (MOON ACROSS THE WAY), Cuaderno San Martín (SAN MARTIN COPYBOOK), El otro, el mismo (THE SELF AND THE OTHER), Museo (MUSEUM) ইত্যাদি।

ভাষান্তর: সৌমাভ

উঠোন

সন্ধে নামে,
ফিকে হয়ে এল উঠানের দু’তিনটি রং,
আকাশ মাতানো জাদু নেই আজ পূর্ণিমার প্রগলভতায়।
উঠান স্বর্গের জল নিকাশী খাল;
উঠান হল সেই ঢালু যা বেয়ে অনন্ত আকাশ ঢুকে পড়ে বাড়িতে।
প্রশান্তমুখে
তারাদের চতুষ্পথে অপেক্ষা করে আঙিনার অমরত্ব,
কী অপূর্ব এই অন্ধকার অবিরোধে বেঁচে থাকা
লতাগুল্ম আচ্ছাদিত আদি উৎসের প্রবেশ পথে!

 

সন্ধ্যারাগ

নীরব বা নাটুকে যেমনই হোক সূর্যাস্ত এক বিস্ময়!
সবচেয়ে আশ্চর্যের হল সূর্যের শেষ মরিয়া আলো– যা ধীরে
ধীরে পৃথিবীকে মলিন করে দেয় যখন সূর্যাস্তের
কোনও রং কিংবা আড়ম্বর অবশিষ্ট থাকে না দিগন্তে।
সেই দৃপ্ত ও অনন্য আলোকে বিশ্বাস করা যায় না—
এ এক মায়া যখন অন্ধকারের ভয়
মহাশূন্যে আরোপিত হয়এবং
স্তব্ধ হয়ে যায় যখন তার মিথ্যাটুকু বুঝি,
ঠিক স্বপ্ন ভাঙার পর যেভাবে
ঘুমন্ত মানুষ বোঝে আসলে সে স্বপ্ন দেখছিল…

 

বৃষ্টি

আচমকা গোধূলি কেটে গেল
বাইরে মিহি বৃষ্টির ফিসফাস,
পতন ও স্খলন বৃষ্টি যেন অতীতের
ঘটে যাওয়া এক সুনিশ্চিত ঘটনা।

বৃষ্টিপতনের শব্দ মনে পড়ায়
হারানো সময়ের বিস্ময়-নিয়তি ;
একটি ফুলের নাম ও রং—
গোলাপ ও তার জটিল রক্তিম চিহ্ন।

শার্শির উপরে পর্দাবিছানো বৃষ্টি যেন
বিস্মৃতপ্রায় এক শহরতলির দ্রাক্ষাবনে লুকানো দুয়ারে
রাঙিয়ে তুলছে অপরাধী আঙুরগুলোকে…

সন্ধের বৃষ্টি ফিরিয়ে আনে সেই স্বর
বাবার প্রিয় কন্ঠস্বর,
যিনি ফিরে এসেছেন এখনই, যেন কোনও দিন মারাই যাননি!

 

কষাইখানায়

বেশ্যাদের বাড়িগুলোর চেয়েও
নির্লজ্জভাবে মাংসের দোকানগুলি
রাস্তায় প্রদর্শন করছে নিজেদের বেইজ্জতি।
দরজার উপরে ছাল ছাড়ানো
এক বলদের মুন্ডু
বিগ্রহসম উদাসীন রাজকীয়তায়
অন্ধ চোখে অপলক তাকিয়ে
বিশ্রামদিনের মোহিনী বেশ্যাদের দিকে।

 

বিদায়

তিনশ দেওয়ালের মতন তিনশ রাতের
আবির্ভাব ঘটুক আমি ও আমার প্রেমের ভিতরে
সমুদ্র আমাদের দুজনের মধ্যে এক অলৌকিক শিল্প

দৃপ্ত হাতে সময় ছিঁড়ে ফেলবে
বুকের ফিতরের জটপাকানো রাস্তাগুলো;
স্মৃতি ছাড়া থাকবে না আর কিছুই।
(সেই যন্ত্রণাময় বিকেল, তোমাকে দেখবার
প্রতীক্ষায় বিনিদ্র রাত আর আমার বিষণ্ণ নিয়তি;
হতাশ আকাশ ডোবার তলায় লুকিয়েছে মুখ
অপমানিত ভ্রষ্ট ফেরেস্তার মতন…
তোমার জীবন আমার ইচ্ছেয় দিয়েছে লাবন্য
আর ক্লান্ত চারপাশ আমার প্রেমের আভায় জ্বলজ্বল করবে…)

ভাস্কর্য মূর্তির পরম অবিনশ্বরতার মত
তোমার শূন্যতা চারদিক খাঁ খাঁ করে দেবে…

 

মন্টিভিডিও

তোমার সন্ধেবেলায় ডুবলাম আমি যেভাবে
ঢালু বেয়ে গড়িয়ে যায় সব ক্লান্তি অবসাদ।
ছাদের উপরে রাতের অল্পবয়েসী ডানা
তুমি যেন আমাদের সেই পুরানো বুয়েন্স আয়ারস
যা ধীরে ধীরে দূরে সরে-মুছে গেছে,
স্বচ্ছ জলের অপর তারার মতন
তুমি ও তোমার সব আনন্দ শুধু আমাদের,
সমস্ত রাস্তা শান্ত অতীতে থেমে আছে সময়ের মিথ্যে দরজায়,
মিষ্টি খয়েরি জল ছুঁয়ে যখন ভোর আসে
আমার জানালার আগেই রাঙিয়ে দেয় তোমার বাগান।

শহরকে পড়া যায় কবিতার মত
যার আলো ফুটে থাকে রাস্তায়, দুয়ারে দুয়ারে…

 

বর্হেসেরা

বর্হেস অর্থাৎ আমার পর্তুগীজ পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না,
তাঁরা একটা ভূতুড়ে জাতি ছিলেন যাঁরা এখনও
তাঁদের বহু গুপ্ত সংকেত, কৌশল, অভ্যাস
ও প্রযত্ন আমার শরীরে নিয়মিত চালান করে যান।
ছায়াদেহী তাঁরা যেন কোনও দিন ছিলেন না এই পৃথিবীতে,
শিল্পের সমস্ত প্রকরণে তাঁরা অনভিজ্ঞ,
রহস্যময় ভাবে তাঁরা সময়, পৃথিবী ও ধ্বংসের এক স্বরূপ আবিষ্কার করেছিলেন।
তাঁরা প্রাচ্যের মহান দেওয়ালে বলপ্রয়োগ করে বালির সমুদ্রে পতিত হন,
তাঁরা সেই অতীন্দ্রিয় বালুকাদ্বীপের রাজা।
আর যাঁরা বাড়িতে রয়ে গেছেন
তাঁদের স্থির বিশ্বাস সেই রাজা এখনো জীবিত!