পঞ্চ কবির কবিতা

কেন যাব
মধুমিতা চক্রবর্তী

যাব না কোথাও,
ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ মেখে নিশিন্দা পাতার মত লেপটে পড়ে থাকব
পোরবস্তিতে, ডিমা নদীর তীরে।

ডলোমাইট ভেসে আসা সাদা জলে চাল ধুয়ে ভাত বসাব,
চারটে ভাত ছ’জন মিলে খাব, গেঁড়ি গুগলি মেটে আলু সেদ্ধ মেখে…

বর্ষা বাদলা হিম জোনাকির আলো নিয়ে এই ভাল থাকা ছেড়ে কেউ যেতে পারে!

 

মহামায়া
রিমি দে

শরতেও আষাঢ়ের ছেঁড়া ফাটা মেঘ
পুজো এসে যাবে
স্কুল ছুটি হবে

জীবন বিজ্ঞান ক্লাস
ঢোল স্যার খাতায় সালোকসংশ্লেষ বোঝান
ধূপবাতি হয়ে গেলে শুদ্ধঘরে বিজ্ঞান হাসে
ছায়ামাখা ক্লাসে

পেনসিল আঁকে স্যারের বিশেষ জ্ঞান
আমিও তুখোড় ক্লাসে হায়েস্ট মার্কস

পুজোতে বৃষ্টি নামে প্যান্ডেলে লতা ও কিশোর
ঘরের ভিতর নতুন পোশাক
অষ্টমীর ভোগ বেলপাতা আলতো শিশির শেফালি
ঘিয়ে ডোবা পদ্মের কলি

গুটিপায়ে পুজো আর বিজ্ঞান মিলেমিশে একাকার

সারাগায়ে প্রদীপের রং আলোর বেণু বাজে মৃদু!

 

রূপকথা
অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

একদিন তো অতিক্রমের দিকেই, না-বলার দিকেও। সেখানে শ্রবণ ঘন হয়ে কথাগুলো অকিঞ্চিৎকর। যেভাবে বিকেলবেলার রোদ পড়ে এলেও আলো ছেড়ে যায় না দিগন্তেরেখার মায়া! কার্যকারণ জানার সমস্ত কৌতুহল একটা একটা করে খুলে যায়। নিজের এবং অপরাপর অজুহাত লক্ষ্মণরেখার অন্যদিকে রেখে নির্জন মেয়েটি একা একা উপত্যকায় নামে—ইতস্ততঃ পড়ে থাকা তীর ও বর্শাগুলো কুড়িয়ে উনুনে গুঁজে দেয়—আগুনে খিদেয়। ভাত ফোটার গন্ধে উড়ে আসে কাক ও চড়াই। রুখুসুখু বাদামীর ওপর প্রবল বৃষ্টি পড়ে সারারাত ধরে।

 

সম্মোহন
মনোনীতা চক্রবর্তী

ছায়া আর আগুনের গল্প লিখছিলাম তখন। ক্ষাণিক্ষণ আগে ঘটে গ্যাছে নিরানব্বইটি আত্মহত্যা এ শহরে। অসম্ভব শোক-উল্লাস চলছে। ভেষজ ফেস-ওয়াশের গন্ধ ভেসে আসে সর্বশেষ লাশটির থেকে। বারবার এডিট অপশনে যাওয়া আর এক ঢোক জল খাওয়া।

ক্ষাণিক্ষণ আগে ঘটে গ্যাছে নিরানব্বইটি আত্মহত্যা। বেণী থেকে খুলে আসছে মধ্যরাত। নেমে আসছে পাহাড়ি উপকথা। রাজপথ ভ’রে গ্যাছে দর্শক আর হাততালিতে। আমাকে একটি ছায়া ও আগুনের গল্প লিখতে হবে। প্রকাশক তেমনই চেয়েছেন। কিন্তু আমি আটকে গেছি মর্গের বাসি সাদাচাদরে।

আরও দ্রুত নেমে এসেছে পাহাড়ি উপকথা।তোমার খামার বাড়ির বৃত্তান্ত। বাড়ি বলে গ্যাছে তাকেই শুধু পছন্দ হয়েছে। আর কেউ নেই কোথাও। শুধু সফেদ কাপড়ে মোড়ানো অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি আর ছড়িয়ে গিয়ে মিলিয়ে যাওয়া আবার মিলিয়ে গিয়ে ছড়িয়ে যাওয়া হাততালি ।

আর কেউ নেই কোথাও।আমাকে একটি ছায়া ও আগুনের গল্প লিখতে হবে। আমার সব ছায়ারা কী অদ্ভুতভাবে আগুন হয়ে যাচ্ছে আর আগুনগুলো ছায়া হয়ে শুয়ে আছে আমারই পাশে।

ক্ষাণিক্ষণ আগে ঘটে গেছে নিরানব্বইটি আত্মহত্যা
এ শহরে…

 

জাতিস্মর
মাধবী দাস

কলঘরের চাপা কান্না শোনে ভেজা দেওয়ালেরা
শ্বেতপাথরের চকচকে মেঝেতে পুনর্জন্মের ছায়া
কুঞ্জনগরের ছবি ভেসে উঠছে প্রতিটি ছায়ায়
সেই মহা দূর দেশে তরঙ্গে তরঙ্গে দীর্ঘশ্বাস

হারিয়ে এসেছি এক দেহাতি বিহারি জন্ম
আচ্ছাদনীয় চাদরে বাঁধা ছিল গাঁটছড়া
আরও ঝাপসা কিছু আছে যা মনে পড়ে না

সব স্মৃতি ফিরে পেলে জাতিস্মর হয়ে যেতে পারি
এসব বিজ্ঞান-তত্ত্ব সবটুকু জেনেবুঝে
হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে একা কলঘরেই বসে থাকি
পুনর্জন্মে পরকাল খুঁজে পাই যদি…

পরকাল আর কতদূর?
সে ছায়া কি ভেসে আসে তিব্বত সীমান্ত বরাবর?
সেখানেও নগরের চা পাতারা মোহে আটকে থাকে?