রঞ্জন ভট্টাচার্য

জন্ম: ১৯৮১ সালে শ্যামনগরে।
কলা বিভাগে স্নাতক
পেশা: শিক্ষকতা।
কাব্যগ্রন্থ: ছায়া বিকেলের ঘর (২০১৭)

ডাকাডাকি

৩৫
তোমাকে আজ পর্যন্ত যা যা বলেছি, বন্ধুরা সব মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। তোমাকে সকালের সর্ষে ফুলের মধ্যে বসিয়ে রেখে গোধূলির কচুরিপানার ফুল এনে দিয়েছি। আমি আর তুমি ছোটদের সঙ্গে গোল হয়ে বসে একদিন মিডডে মিল খেয়েছি। একটা মেয়ে তোমার ওড়নায় খিচুড়ি মুছে পালিয়েছে। আমরা ওর শারীরিক জোয়ার দেখেছি মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারিনি। দু-একটা বাচ্চাকে ধরে ধরে উচ্চতা বোঝাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমাদের জটিল ভাষা বুঝতে পারেনি। ওরা যে জলকে জলই বোঝে, বুঝে উঠতে পারিনি এতদিন। শুধু শুধু নাম টাম দিয়ে ওদের কাছে ভুল বিশ্লেষণ করছিলাম। শরীরের উচ্চতাকেই মূল্যবোধের মাপকাঠি ধরে নিয়েছিলাম। পর্বতের ওপারে থাকা মানুষের যন্ত্রণা সম্পর্কে কোনও ধারনাই নেই। ইচ্ছে আছে গনগনে রোদ্দুরে তোমার  ওড়নায় মাথা ঢেকে যন্ত্রণার অ আ ক খ প্র্যাকটিস করব।

আর উত্তরবঙ্গের দিকে মুখ করে টানা একুশ দিন ধরে তাকিয়ে থাকব।

৩৭
জ্বালানী ফুরিয়ে এলে অভিমান দূরে সরে যায়। অস্থায়ী মন সর্বশেষ বিকেলের দোয়া নিয়ে ফেরে। ফিরে এসে ডেকে নেয় জীবনের অলীক বাসনা। হাতে নিয়ে প্রাণঘাতী বাশি দূর থেকে সূর তোলে আমাদের প্রথম সন্তান। সে তো আগামীর দূত। এই ছায়াময় শিল্পের দিশারী। বুকের ভাঙন বিষয়ক গান এই সুরে উঠেছিল জানি। শরীরের ফুল তুলে সাজিয়ে রেখেছি তাকে। আমাদের স্বপ্নময় বিষণ্ণ আকাশ নোঙর ফেলেছে এক উন্মুক্ত চোখে। এই যুক্তিহীন ভালবাসার বিবরণী সেও কি জানে না! একাকী প্রেমের উপন্যাস অর্থহীন তবে? নিশ্চিন্ত ঘুমের ইতিহাস এ বাড়িতে নেই। সামান্য তুফানে কবে উড়ে গেছে চাল। এ বাড়িতে ঠাই পাওয়া দায়। এ বাড়িতে ভরসাটুকু গুঁড়ো হয়ে গেছে। অভিমান দানা বাঁধে সজোর স্লোগানে স্লোগানে। সশরীরে ভেসে আসে আমাদের ভেঙে যাওয়া স্বর। বিকেলের ঝড়ে ভেসে আসে তার অভিমানী মুখ। আবহাওয়া দফতর এসবের কিছুই জানে না।

অস্থায়ী মন সর্বশেষ বিকেলের দোয়া নিয়ে
ফেরে।

৩৮
অন্তরের কথা কখনওই বুঝিয়ে বলতে পারিনি। আশ্চর্য ভাবে যে দিকেই মুখ করে কথা বলছি, সবটুকু উত্তরবঙ্গের দিকে চলে গেছে। কিছুতেই বুঝতে পারছি না হাওয়ার বিপরীতে এত কথা যাচ্ছে কিভাবে? অথচ এত অনুকূল বাতাস থাকা সত্ত্বেও তুমি নীল ডানা মেলে ভেসে আসতে পারছ না। এই তুচ্ছ প্রাণ নিয়ে স্রোতের বিপরীতে যেতে পারি! তুমি দশমী ভাসানের দেবী, ধেবরানো টিপ আর জোর করে গুজে দেওয়া মিষ্টি মুখে নিয়ে স্রোতের অনুকূলে ভেসে আসতে পারো না! এমন ঠাকুর তুমি এমন প্রেম সামান্য ঘূর্ণিপাক সামলাতে পারো না! আমার যতটুকু টান তার সবটুকুই এ যাবত তোমাকে দিয়েছি। গোটা মাঠ জুড়ে পরে থাকা ধুলো বালি তুমি। সবাই পাড়িয়ে গিয়েছে, খেয়াল করেনি। যত দিন গেছে ধুলো ধুলোময় হয়ে গেছি। দুটো হাতে ধুলো মেখে জুরিয়েছি প্রাণ।

এখন প্রতিটা গরাসে হে কাকড় আমার ভাতের থালায় কি যে সর্বনাশ এনেছো!