রিপন হালদার

রিপন হালদার

লেখালেখির সূচনা ছোট বেলা থেকেই। দুহাজার সালে রানাঘাট কলেজ থেকে স্নাতক। ঐ কলেজে সেই বছর কবিতা ও গল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম তিনে স্থান পাওয়ায় লেখার প্রতি উৎসাহ বাড়ে। প্রথম দিকে কবিতা। তারপর গল্প-উপন্যাস। ভালো লাগে বিশ্ব সাহিত্য, সিনেমা, সংগীত। অচেনা গ্রামের নির্জন মাঠ ঘাটে মেঘলা দিনে একা একা ঘুরতে ভীষণ ভালো লাগে।

প্রকাশিত বই-
বৃষ্টির কথা হচ্ছে (কবিতা। ২০১৪। ধানসিড়ি প্রকাশন), অংকফুল (কবিতা। ২০১৭। মেঘমল্লার পাবলিশার্স ), এখানে অমল নামে কেউ থাকে না (গল্প সংকলন। ২০১৯। তবুও প্রয়াস

 

কুড়ি পয়সার চাঁদ

লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। চেক হাফ হাতা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসা মাংসল স্বাস্থ্যবান দুটি ফর্সা হাত ওঠানামা করছে। পাটের চটে বাঁধা থলি থেকে চারকোনা আকৃতির একেকটা পাতা নিয়ে তার মধ্যে খয়েরি রঙের গুঁড়ো পাতার কুচি ভরে ভরে নলের মত কিছু তৈরি করছে। একটা কঞ্চির কাঠি দিয়ে আবার ঐ নলের মাথা আর পিছন গুঁজে দিতে থাকল।

প্রায় দশ-বারোটা এই রকম পাতার নল বানানো ছেলেটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। হাতদুটোর ওঠানামার সাথে লোকটার দেহটাও মৃদুমন্দ দুলছে। ঝাঁকড়া চুলের মাথাটাও দুলছে। নিচের দিকে তাকিয়ে। মৃদু গুনগুনও যেন শোনা যাচ্ছে। ছেলেটি এবার লক্ষ্য করল ছোট কুলোর সামনের দিক প্রায় ভর্তি হয়ে উঠেছে ঐ পাতার নলে। ছেলেটি তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে বড় গোছের একটা লোহার কাইচি ঐ হাতদুটোয় উঠে আসছে। কাজ শেষে আবার পরে থাকছে চটের বস্তার উপর।

ঐ লোকটা একা নয়। এটা একটা দোকানের মত। এবং আরো তিন-চারজন ঐ লোকটার আসেপাশে একি কাজে ব্যস্ত। হাফ প্যান্ট আর টেরিকটের জামা পরা ছেলেটি দোকানের ডান দিকের ঝাঁপ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর লোকটা একবার ঘাড় উচু করে ছেলেটিকে দেখল। তারপর আবার ডুবে গেল নিজের কাজে।

আরো কিছুক্ষণ পর কাজ থামিয়ে লোকটার একটা হাত কুলোর নিচে থাকা পুরোন খবরের কাগজের নিচ থেকে কুড়ি পয়সার একটা সাদা এলুমিনিয়ামের ছয় কোন বিশিষ্ট চাকতি ছেলেটির দিকে তুলে ধরে। ছেলেটি হাত পেতে নিল। তারপর চলে আসে দোকান থেকে। ওর পিছনে দুটো মৃদু শব্দ ধাওয়া করল-“দেখে যাস্‌”।

হ্যাঁ। দেখেই যায় ছেলেটি। রাস্তার বাঁ দিকে পিচ যেখানে শেষ, সেই ঘাস আর পিচের মাঝখানে কাঁকরময় স্থানের উপর দিয়ে ও বাড়ি ফেরে। ডান হাতে ছয়কোন আকৃতির একটি সাদা কুড়ি পয়সা। তাতে জেলেদের মাছ ধরার ছবি। চকচক করছে মাছের দেহটা।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বছর আটের ছেলেটি এবার তোলা উনুনে গুল দেয়। আঁচ উঠলে এক চিলতে ভাড়ার ঘরের সামনে সরু বারান্দায় উঠোন থেকে বালতির মত উনুনটা নিয়ে আসে। আঁচ বেশি উঠে গেলে পাশের ঘরের মাসিকে বলে উনুনটা বারান্দায় উঠিয়ে দিতে। তারপর দুই কৌটা চাল এলুমিনিয়ামের গামলায় ধুতে থাকে। হাড়ির জল গরম নাহলে চাল দিতে নেই মা বলেছে। জল গরম হলে ও ধীরে ধীরে চাল ফেলে হাড়িতে। মাঝেমাঝে হাতে লেগে যাচ্ছে গরম জলের ছ্যাঁকা। তারপর চাল সমেত হাড়িতে পড়ে দুটো বলের মত আলু।

প্রতিদিনের মত রান্না চড়িয়ে ছেলেটি পড়তে বসে। সামনে নজরুলের ‘লিচুচোর’। কিছুতেই মুখস্থ হতে চায় না। চোখে ভাসে মাস্টার মশাইয়ের দুই হাতে দুটো কঞ্চির ছবি। কে যেন সেই ছবি বুজিয়ে দিতে থাকে। তীব্র আঠা চোখে লেপ্টে আছে। চোখদুটো আর খুলে রাখা যাচ্ছে না।

কেরোসিনের কুপির সামনে বই খোলা। পাশে শুয়ে পড়ে ছেলেটি। হাঁটু মুড়ে। প্রায় ‘দ’ হয়ে। মিনিট কুড়ি পর ভাত পোড়া গন্ধের তাড়া খেয়ে পাশের ঘরের মাসি ছুটে আসে। -“আজ তোর কপালে দুঃখ আছে রে, অমল!” অমলের দেহ ঘুমে অচেতন। সাড়া দেয় না। মাসি হাড়ি নামিয়ে উনুন নিভিয়ে চলে যায়। পিছনে রেখে যায় আরো কয়েকটি শব্দ। -“তোর মা আজ এতো দেরি করছে ক্যান, কে জানে!”

পিঠের উপর ভারী কিছু পড়ার অনুভূতি হয় অমলের। কী যেন দেবে যাচ্ছে পিঠের ভিতর। কাদার মধ্যে বল দেবে গেলে যেমন হয়। চুলের মুঠি ধরে কে যেন উপর দিকে টানছে ঘাস টানার মত। লাল চোখে জেগে ওঠে ছেলেটি। না, স্বপ্ন নয়, লাঠি হাতে মা। মাসি ছুটে আসে। -“খবরদার সরমা! অরে মারবা না!” –“মাইরাই ফেলুম। চালগুলা নষ্ট করল। বেজাত কোথাকার! একদম বাপটার মত হইছে!” সরমার ঝাঁঝালো উত্তর। “তুমিই বা আইজ এতো দেরী করলা ক্যান?” মাসি জানতে চায়। “ট্রেন লেট করলে কী করুম মাসি?” সরলার উত্তর-“বাড়ি বইস্যা থাকলে খাওন দেবে কে! অর বাপটা তো পালাইছে আরেক জনরে লইয়া!”

এই কথোপকথনের ফাঁক দিয়ে ছেলেটি এক দৌড়ে ঘরের বাইরে চলে আসে। তারপর আরো এক দৌড়ে বাজার। কত মানুষ, আলো, গাড়ি! কাছেই রেল লাইন। ট্রেন যাওয়ার শব্দ। রাস্তার পাশে আলু কাবলির দোকান। খিদে পেলেও কিছু করার নেই। এই কুড়ি পয়সাগুলো অমল খরচ করবে না।

একটা ছোট্ট টিনের কৌটায় অমল পয়সাগুলো জমা করে রাখে। মাঝে মাঝে ঢালে বিছানার উপর। একটার উপর একটা সাজিয়ে স্তম্ভের মত সাজিয়ে তোলে। চারটে স্তম্ভ হলে একটা ঘর হয়। সেই ঘরে মাকে রেখে অমল চাকরি করতে যাবে। মা তখন হয়ত এতো রাগি থাকবে না। আর সারাদিন ধরে শাস্তি স্বরূপ ওকে পোড়া ভাত আর আলু সিদ্ধ খেতে হবে না।
অনেকটা সময় অমল বাসস্টপে বসে কাটাল। একটা গাড়ির পিছনে মুষ্টিবদ্ধ বুড়ো আঙুলের লাল ছাপ। বানান করে পড়ল thums up। আলো থেকে ধীরে ধীরে দূরের সোজা পিচ রাস্তায় মিলিয়ে গেলো ছবিটা। সিমেন্টের বসার জায়গাটার নিচে আবছা আলো। সেখানে অমল দেখতে পেল একটা দেশলাইয়ের বাক্স। তাজমহলের ছবি। এই মার্কাটা প্রথম পেলো ও। সুবীর কমল ছোটন ওদের কাছে এই মার্কাটা নেই। আনকমন মার্কাগুলোই অমল বেশিরভাগ সময় খুঁজে পায়। এই একটা ব্যাপারে অমল অন্যদের চেয়ে অনেক ধনী। ছবিটা চারকোনা করে সাবধানে ছিঁড়ল। তারপর রেখে দিল প্যান্টের পকেটে।
রাত কটা ও বুঝতে পারল না। চারদিক নির্জন। আস্তে আস্তে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। টিনের দরজা খোলার শব্দ হতেই মাসি বলে-“কোথায় গেছিলি? ভাত খাইয়া শুইয়া পড়!”
তারপর গভীর রাতে খোলা পিঠে কিসের যেন চলাফেরা। একটা চির চেনা হাত ওর পিঠ বেয়ে উপর নিচে ওঠানামা করছে। সন্ধ্যায় রাস্তায় দেখা সেই গাড়িটার মত মসৃণ তার গতি। অমল ঘুমানোর মত জেগে থাকে।

#

সকালটা বড় ভালো লাগে অমলের। ওর ঘুম ভাঙার আগেই মা রান্না সেরে স্নান করে রেডি। এক্ষুনি ট্রেন ধরতে যাবে। তিন বাটির টিফিন কেরিয়ার ভরে নিয়ে যাবে দুপুরের ভাত ডাল আর আলু ভাজা। তারপর ট্রেন মাকে নিয়ে যাবার পর সারাটা দিন অমলের। সকালে স্কুল থেকে ফিরে এসে এই এক চিলতে ঘরের সম্রাট। আমগাছে ঘেরা বড় পুকুরটার মালিক। দুপুরে যতক্ষণ খুশি জলের উপর মাছের মত ভেসে থাকার স্বেচ্ছাচার।
আজ পুকুর পাড়ে দুই হাতে দুই লাঠি নিয়ে ও কে! সর্বনাশ! মাস্টার মশাই! পুকুরের অন্যদিক দিয়ে ঘুরে পাড়ে ওঠে অমল। ‘লিচু চোর’ মুখস্থ নেই।

দুটো ব্রিটানিয়া আট টুকরো করছেন মাস্টার মশাই। প্রত্যেকের হাতে একটা করে পিস্‌। এক পয়সা সাইজের। তারপর মাস্টার মশাই চায়ে চুমুক দেন। এর মাঝে অবশ্য ছোট্ট নিরীহ প্রশ্ন- ‘সবার পড়া তৈরি তো?’
একটু পর বন্ধ ঘরের দরজা জানলা আর বাঁশের বেড়া ভেদ করে একদল গবাদি পশুর দলা পাকানো কান্নার মন্ড বাইরের রাস্তায় ছিটকে পড়তে থাকে।

দুপুরের কড়া সূর্য এখন আর নেই। এখন বিকেল। গলায় অনিয়ন্ত্রিত পাউডার বুলিয়ে অমল এখন হেঁটে যাবে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ। তারপর সেই আশ্চর্য দোকান!
অমল দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিনের মত। কেউ কিছু বলে না। শুধু কয়েক জোড়া ব্যস্ত হাত ওঠা নামা করছে। কী যেন খুঁজে পাচ্ছে না অমল। এতদিন ধরে দেখে আসা সেই স্বাস্থ্যবান পরিচিত হাত দুটো। কোথায় গেল!

আরো কিছুক্ষণ পর হাতের কাজ করতে করতে একটা মাথা একটু উপরে উঠে অমলের দিকে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকায়- ‘বাড়ি যাও খোকন!’ কিছু একটা জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল অমল। কিন্তু পারল না।

ফেরার সময় পিছনে তাকাল। না। কোন শব্দ নেই। হাত নেই। রাস্তার পাশে কাঁকড়ের সীমারেখা ধরে হাঁটতে থাকে। আজ ওর হাতে ছয়কোনা কোন পয়সাও নেই। মাত্র একটা স্তম্ভ তৈরি হয়েছে। আরো তিনটা বাকি। অমল ভাবতে থাকে।
ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। আকাশে গোল রূপালি চাঁদ। আজকের বরাদ্দ ওর পয়সাটা ওই হাত থেকে পড়ে গিয়ে গড়াতে গড়াতে, এই পিচ রাস্তা থেকে কোন জাদুর শক্তিতে আকাশে উঠে গেছে। আর তীব্র ওই ছয়কোনা গুলো জটিল ঘূর্ণন সহ্য করতে করতে গোল হয়ে গেছে। যে গোলাকার ওর চোখের মত ঝাপসা।