সঞ্চারী ভৌমিক

সঞ্চারী ভৌমিক

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্নাতকোত্তর প্রথম বর্ষের ছাত্রী।

বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালিখি।

একমাত্র বই ‘আলপনা বাড়ি‘।

 

১.
খুব বৃষ্টি  হলে  মাটির  রঙ বদলে  যায়,
বৃষ্টিতে  ভেজা  নরমমাটি কে  দেখলে  আমার  মায়ের  কথা  মনে পরে;
সোঁদা গন্ধের  গায়ে  লেগে  থাকে  সদ্যমাঠ থেকে  ফিরে  আসা মায়ের  ক্লান্তিজল।
বৃষ্টিতে  মাটির  সর্বশরীর  ভেজে, আগুনআঁচ  আমার  মায়ের  শরীর  ভেজায়।
তখন মা’কে আমার  এক প্রাচীনবৃক্ষ বলে মনে হয়। যার শরীর জুড়ে নানা পোকার বাস অথচ   পোকারা জানে না – ওই  বৃক্ষকাঠ থেকেই তৈরি হয় দেশলাইবাক্স!

২.
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়  – মনে পড়ে আমি ভালো নেই।
মনে পড়ে যায় এই আমি-ই ভিড় থেকে বেড়িয়ে এসে হন্যে হয়ে খুঁজেছিলাম প্রিয়মানুষের গন্ধ।
গলার কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে যায়  সমস্ত শব্দ!
কুয়াশা জড়িয়ে যায় হাতে-পায়ে-সর্বশরীরে…
ভালো থাকবো না জেনেও  বেড়িয়ে এসেছিলাম  খুঁজতে –
আসলে এই কুয়াশা  হল আমি বা আমার মতন যারা ভালো থাকার নেশায় কোনো এক জলরঙের শ্রাবণে ভিজতে শুরু করেছিলো!

৩.
যারা কখনও নিজের জীবনলিপি লিখে যেতে পারেনি তাদেরও একটা গল্প থাকে, স্বপ্ন থাকে।
যেখানে সকালের মতন  করে  গল্পের শুরু – যেখানে বাতাস গায়ে মেখে, জল ছুঁয়ে দিলেই একসঙ্গে ডেকে ওঠে ভোরের পাখি।
আর,  আমরা অনুসরণ করতে থাকি সময়ের হেঁটে যাওয়াকে…
জন্মেই যে হৃদয়ের ভার তুলে নিয়েছি তাকে  বয়ে নিয়ে বেড়ায় – অথচ যখন সকল হৃদয় মৃত তখনও আমরা জানি না মৃতহৃদয় নিয়ে বেঁচে আছি!
আমরা-ই প্রতিশ্রুত বাহক – নিজেদেরই শরীরকে কাঁধে করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি মৃত্যুদেশে।

প্রতিসরণ

১.
যতদূর চোখ যায়
দেখি,
সহস্র নদীর ছলছল আমার বুকের ভিতর।

২.
আমি শুনি তোমার গলার রং

আজন্ম ছন্নছাড়া কিশোরী অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সেই চোখে!

৩.
নিজের হাতে দেওয়া গিঁটগুলো একটা একটা করে খুলতে গিয়ে দেখি তোরো নম্বরে আটকে গেছি…

আসলে এই সব পিছুটান আমাদের বড় প্রিয়!

৪.
শ্মশান থেকে ফেরার সময় গঙ্গাস্নান করতে হয়…
তবুও,
বাড়ি ফিরে দেখলাম পুড়ে যাওয়া ক্ষতের তীব্রতা আরও দীর্ঘ হচ্ছে!

বিবৃতি

বহু বছর ধরে পাশকাটিয়ে শুধু সরে যেতে দেখেছি, দেখেছি কী ভাবে সমস্ত শৈশব, কৈশোর, যৌবনকে একটু একটু দূরে ফেলে হেঁটে যাচ্ছি। হেঁটে যাচ্ছি নীল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে, নদীপথ, ঝর্ণাপাথর ডিঙিয়ে-বেহিসেবি পায়ে চলেই যাচ্ছি। বিকেলবেলার শিমুলতলীর হাট ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে যাচ্ছে; এতদূরে যাচ্ছি! আরেকটু যাব, তার আগে পথের দুধারের যে অরণ্যরাজ্য পাব সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ থেকে যাব, একসঙ্গে গান করব, নাচ করব, তারপর পাথরের গায়ে আত্মবিবৃতি লিখে আবার হাঁটতে শুরু করবো।
শোনো, এই দোলপূর্ণিমা রাতে অরণ্যরাজ্য সেজে ওঠে; চাঁদের আলো অরণ্যজুড়ে জলসাঘর সাজায়…
তোমার জন্য এই এখানেই আমার ঠিকানা রেখে গেলাম;
যদি কখনও আমায় চিঠি লেখার ইচ্ছে হয়, হয় তো!

ভ্রম

-ঠিক কবে রাস্তায় পা বাড়িয়েছিলাম মনে পড়ে?
-তারপর কত বর্ষা কেটে গেল… মনে পড়ে?
-কাব্যি করে বলতে পারছি না এতকিছু-এইসবের মধ্যে আসল কথাটা তো তলিয়ে যাচ্ছে…
-কেন? রাস্তা টা তো নদীর মতো! তলিয়ে যেতে দিতে আপত্তি কোথায়?
-তবু আমরা কেমন ভালোবাসায় মেতে ছিলাম
-স্বপ্ন দেখার অভ্যেস ছিল যে!
-আর দুঃস্বপ্নও তো হতে পারে?
-হ্যাঁ যেমন সবার থাকে।অথচ…
-স্বপ্নটাই তো সব! যেমন ঘুম ভাঙে, আর আবার আমরা পথ চলা শুরু করি!