সংগ্রাম জেনা

ওড়িয়া সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি সংগ্রাম জেনা ওড়িয়া ও ইংরেজি দুই ভাষার লেখক। জন্ম ১৯৫২ সালে হলদীবসন্ত গ্রামে। এ পর্যন্ত পঞ্চাশটিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে পাঁচটি ওড়িয়া ও তিনটি ইংরেজি কবিতা সংকলন রয়েছে। অনুবাদ হয়েছে ইংরেজি, হিন্দী, বাংলা, তামিল ও মারাঠি ভাষায়। কবিতার জন্য পেয়েছেন ভানুজিরাও স্মারকি পুরস্কার এবং অনুবাদের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। বসবাস ভুবনেশ্বরে।

মূল ওড়িয়া থেকে অনুবাদ: অজিত পাত্র

পিছনের দৃশ্য

তুমি দেখবে
সমুদ্র কিভাবে অস্থির হয়
প্রথম প্রেমে পড়ে থাকা
স্কুল মেয়েটির মতো।

তুমি দেখবে
পাতা কিভাবে কাঁপতে থাকে
যেমন ঠোঁট
প্রথম স্পর্শে।
তুমি দেখেছো
চাঁদ কেমন লুকিয়ে থাকে
মেঘের পিছনে
যেমন দস্যু
ঝোপের আড়ালে।

তুমি দেখবে
জীবনের যত দুঃখ, শোক
মিলিয়ে যায়
শিশির বিন্দুর মতো
সকালের নরম রোদে।

পিছনের সব দৃশ্য
শুধু দেখতে পাবে
দর্পণের ভেতরে।

 

চিহ্ন

চিহ্ন কোথায় বা না থাকে?
সুর্যাস্তের পর আকাশে
বর্ষার পর মাটিতে,
দুঃখের পর হৃদয়ে,
পুজোর পর প্রতিমা
সংভোগের পর শরীরে।

চিহ্ন কি নিভে যায়
না, নেভার পরেও
চোখের আড়ালে থেকে যায়।

যেমন ইন্দ্রের আঁচড় অহল্লার শরীরে
যেমন কদম্বের ছায়া যমুনার জলে
যেমন তোমার হাতের ছাপ
আমার কবিতার পাতায়।

দাগকে খোঁজা বৃথা
যেমন খুঁজেছিল শকুন্তলা আংটিকে
নদীতে, মাছের পেটে, রাজদরবারে
যেমন রাত পোহালে চন্দ্রসেনা খুঁজেছিল
কারো নখের, দাঁতের চিহ্ন রাধার শরীরে।

চিহ্ন সব এমনি রয়ে থাকে, ওইখানে, চিরদিন
খোঁজার লোকই
ব্যাকুল হয়ে খুঁজতে থাকে
রমণ থেকে মরণ পর্যন্ত।

 

রাত নামে

রাত কী অপেক্ষা করে বসে থাকে
কখন আমারা পার্কের সিমেন্ট বেঞ্চে
কাছাকাছি বসাবো।

বাড়িতে ফেরার পর
পড়ার টেবিলের কাছে
কারো ছায়া গাঢ় হয়ে থাকে
চলতে থাকে যেমন
ঘণ্টার কাঁটা পিছন ছাড়ে না মিনিট কাঁটার
খাওয়ার টেবিল, বারন্দা
আর শেষে ঘুমানোর বিছানা পর্যন্ত।

আমার লেখা পংক্তিতে থাকে
পুরনো শব্দের ছায়া
নতুন শব্দ সব চৌকাঠের ওপারে
দাঁড়িয়ে উঁকি দেয়
কখন সুযোগ পেলে ভেতরে আসবে।

স্বপ্নের মুঠো থেকে খসে কেউ ডাকে
অনেক হল, লেখা বন্ধ কর, শুয়ে যাও
এই তো সব দুঃখের নিদান।

কতদিন আর বিশ্বস্ত হাতের জাদু চলবে
এই শরীরের জটিল জ্যামিতি বুঝতে
বুঝতে পারি বলাটাই তো আর এক ছলনা।

আর একবার শব্দসব উবিয়ে যেত
রইতো গিয়ে পাখির ডানায়, ঝর্ণার জলে
মেঘে, তারায়, আর কারও
কথা না বলা আধোবোজা চোখে।

বছরের পর বছর আমি শিখেছি কিভাবে ঠৌঁট চুপ থাকে
সময়ের কৃতদাসের মতো
না থাকে অনুরাগ, না অনুশোচনা,
আর একবার রাত্রি না আসা পর্যন্ত।

 

আমি কি চেয়েছিলাম

আমি কি চেয়েছিলাম
তোমাকে, স্বপ্ন না সম্ভাবনাকে?
প্রতিক্ষণ আসতে থাকবে তোমার আসার খবর
এও হতে পারে
থাকবে সব সম্ভাবনা তোমার না আসার।

যা বর্ষা, বন্যা, বাতাস হয়ে
আমার কাছে আসতে থাকে
আর আমার কাছে পৌঁছানোর আগে
পাহাড়, জঙ্গল দেহের টানে
ওখানেই সব দিন রয়ে যায়।

দিনে ছায়া হয়ে যা বদলাতে থাকে
সকাল থেকে সাঁঝ,
আবার রাত হলে তারা হয়ে
ছড়িয়ে থাকে আকাশের গায়ে
আর ভাসতে থাকে নীল নীল পুকুরের জলে।

ছুঁয়ে দিলে সব অস্থির
ওর মন, শরীর, আসক্তি, আকার
তাইতো কাছ থেকে দূর
শরীর থেকে ছায়া বেশি নিজের।

কখনো কখনো এসব ঠিক লাগে,
আবার মনে হয় ভুল হতে পারে
কাউকে কিছুও শোনাই
ঈশ্বরকে তো কোনদিন নয়,
যেহেতু,
আমার, আমার সপ্নের
আর আমার সন্দিগ্ধ ছায়ার
তুমিই দ্বিতীয় ঈশ্বর।