সৌরভ শইকীয়া

সৌরভ শইকীয়া  |  জন্ম ১৯৬৯

১৯৬৯ সালে লখিমপুর জেলার জালভারী গ্রামে জন্ম। প্রকাশিত কবিতার বই ‘শিমলু সাগর’, ‘সরাপাতর ভায়োলিন’, ‘সৌরভর সোনারু ভ্রমণ’ এবং ‘সৌরভ শইকীয়ার নির্বাচিত কবিতা’। সার্ক সাহিত্য উৎসবে আমন্ত্রিত কবি হিসেবে যোগদান। ২০১০ মনে ভারত ভবন, ভূপালে অনুষ্ঠিত নর্থ ইস্ট অ্যাণ্ড ওয়েস্টার্ণ পোয়েট্রি ফেস্টিভেল এ আমন্ত্রিত। কন্নড়, বাংলা, উড়িয়া, তামিল, হিন্দি আদি ভাষাতে কবিতা অনূদিত হয়েছে।

ভাষান্তর  |  বাসুদেব দাস

একটি রূপকথা

চাঁদ নামে এক বুড়ি ছিল
আর সূর্য নামে পাকাচুলের বুড়ো ছিল।

ওরা দুজন আর আকাশটা
তারাদের নিয়ে তাদের সংসার।
কোনো কথায় একদিন বুড়ো-বুড়ির মধ্যে ঝগড়া লাগল।
অভিমানে বুড়ো বেরিয়ে পড়ল সাগর পারের মেয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
বাঁশবাগান দিয়ে নেমে যখন সে পশ্চিম সাগরতীরে
তখন বিকেল বিদায় নিয়েছে
…লাল লাঠির সাহায্যে কেঁপেঁ কেঁপে
বুড়ো জলের ঘাটে নেমেছে কী নামেনি
শিকারি ঢেউগুলি তাকে কেড়ে নিয়ে পাতাল চলে গেল।
রক্তে তার জল লাল হল,ঢেউগুলি লাল হল
আর পার না হওয়া সাগরটাও।
সেদিন বিকেলে বুড়ো সাগরে ডুবে মরল।

এই কথায় বুড়ি খুব দুঃখ পেল।
চোদ্দ রাত না খেয়ে-দেয়ে সে শুকিয়ে ক্ষীণ হয়ে গেল
বুড়োর আত্মার খোঁজে সে বিবাগী হল।

তারপরে কী হল?

অমাবস্যার পরে একদিন বিকেলে
পরিত্যক্ত বাড়ির সেই সপ্তপর্ণীর ডালে
একটা কাঁচি হয়ে সে ঝুলে ছিল।

 উজ্জ্বল মৃত্যু

সত্যি সত্যিই সে চাঁদটাকে
ভালবাসল

কেন না, চাঁদের বিষণ্ণ চোখ
কেন না, চাঁদের রক্তাক্ত বুক

আকাশে সুর…যখন নেশা লেগেছিল
সরষে ফুল দিয়ে ছেঁচড়ে ছায়াপথে নামার সময়
সে অনুমান করল
আরও একটি চাঁদ
আরও একটি চাঁদ

জলে নাচন

চাঁদটাকে ধরার জন্য
সে ঢেউয়ের ওপর দিয়ে দৌড় লাগাল
সে দৌড়াল…
সে দৌড়াল…

এবং অবশেষে,যদি আমার সঠিক মনে থেকে থাকে
চাঁদ নয়,জল তাকে ঘিরে ফেলল

বিবাগী
ফিরে আসতে পারল না।

তোমার জীবন্ত চোখজোড়া

নিঁখুত আইলাইনারে নীল রেখা টানা
তুমি?
অল্প যেন লজ্জ্বা করে
চোখ নীচে নামালে…কেঁপে গেল
আমি পড়লাম তোমার চোখে রাশি রাশি রক্তিম হাসি
আমি ছিঁড়লাম তোমার চোখে হাজার হাজার তারার পাপড়ি

তুমি?
তোমার নীলাভ প্রায় কুঞ্চিত কেশদামের নীচে
এটা কোন সরোবর
গান গাইছে তোমার চোখজোড়া
পাতা খসাচ্ছে তোমার চোখজোড়া
কিন্তু, কী সুন্দর সেই চাহনির কালো তারা
চোখের পাতা খুলে গেল নিশ্চয়
রূপালি রেখার ক্ষীণ দ্বিতীয়া
তোমার চোখদুটি
তোমার চোখ দুটি…হঠাৎ,
ইস।

এইমাত্র আমি দেখলাম –
কামাখ্যা পাহাড়ের বাঁকা গুলঞ্চের নীচে
অবাক হয়ে তুমি
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রয়েছ।

সবুজ গাছ

শীতের মাঝরাতে
ঝলমলে তারাগুলির মধ্য দিয়ে কে নিক্ষেপ করেছে তার দিকে
রূপোর লতায় লেখা এই বাণী:

প্রত্যেক মানুষই প্রিয়জনকে হত্যা করে।
কাপুরুষ হলে চুম্বনে আর
কিন্তু, হে হৃদয়।
আমার বিষণ্ণ বেদনায় এই পৃথিবীতে
আপনার নামে হেলতে দুলতে থাকবে
একটা সবুজ গাছ
যার পাতা কখনও মাটিতে খসে পড়েনি

ও। সে
তেজপুর কেতেকীবাগানের উগ্রগন্ধা সেই সর্পকন্যাই
হবে বোধহয়
যার চোখের জল শুভ্র মালার মধ্য দিয়ে
একদিন সত্যিই আমি পিছলে যাব বলে ভেবেছিলাম

সৌরভের মৃত্যু সংবাদ

বসে থাকার জন্য মৃত্যু ঘটেছে
একটা ফুলে বসে দুলতে থাকার জন্য সৌরভের মৃত্যু ঘটেছে
ভোমরা উড়িয়ে দেবার জন্য রামধেনু চুরি করার জন্য
ইঞ্চি ইঞ্চি আকাশের যুদ্ধে সৌরভের মৃত্যু ঘটেছে
সৌরভ মরেছে
একা উজানে ঘুরে বেড়ানোর জন্য
মিট মিট জোনাকি পোকার বাঁশবনে ঘর তৈরি করে সৌ্রভের মৃত্যু ঘটেছে

একশো শতাংশ মৃত্যু।
ডাস্টবিনে পচে মরল বলে নিশ্চিত হয়েছে জন্তুগুলি
দুই মোষের বাজিতে সৌরভের মৃত্যু ঘটেছে
অজানা আততায়ীর হাতে সৌরভের মৃত্যু ঘটেছে

একটুকরো উজ্জ্বল নির্জনতায় সৌরভের মৃত্যু ঘটেছে
সপ্তপর্ণীর হলদে সরবত খেয়ে সৌরভের মৃত্যু ঘটেছে
জ্যোৎস্নার বন্যায় সৌরভের মৃত্যু ঘটেছে
চুম্বনে বিষ চেটে
কোকিলকে শিমুল বলে ভুল করে জালে পড়েছে
একটা পাহাড়ি পাথর একটা ছোটো গ্রামের মায়ায় সৌরভের মৃত্যু ঘটেছে
সৌরভ মরেছে
সৌরভ মরেছে
রূপোলি, পাগল ঢলের মতো নেচে নেচে আসে এই খবর
কে হেনেছে ছুরি বাতাস হাসছে বাতাস হাসছে
মাইলের পরে মাইল অনন্তে সৌ্রভ হারিয়ে গেছে
ফুল নয়, তুফান লিখেছে

সত্যিই সৌরভের মৃত্যু ঘটেছে।