স্পন্দন চট্টোপাধ্যায়

উত্তরপাড়া রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাশ করে এবং পরে ন্যাশানাল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি, আগরতলা থেকে স্নাতকোত্তর পাঠক্রম সম্পূর্ণ করেন ২০১৭ সালে। প্রকাশিত বই: ‘রিটার্ন টিকিট নেই’, ‘ক্লিভেজ জুড়ে দেওয়াল লিখন হোক’। বর্তমানে মুম্বইয়ে Cine Riser Digital Media Pvt. Ltd.–এ Content Writer, Editor & Social Media Executive হিসেবে কর্মরত।

ছায়া

সবারই কেমন ছায়া পড়ার জায়গা আছে! আছে না?
মেঘের ছায়া পড়েছিল পাখির ডানায়,
পাখির ছায়া গাছের পাতায়, তার শাখায়, ডালে,
আর গাছও তার কপালটুকু নুইয়ে দিয়ে নদীর স্রোতে… স্রোতের বুকে,
যেমন আমার ওপর বটের ঝুড়ির মতো তোমার ছায়া পড়ে!
নদীর ছায়া… হ্যাঁ, তাও পড়ে ঠিক, তার বুকভর্তি
নুড়ি জুড়ে, পাথর জুড়ে, বালির ওপর…
তারপর সেই নুড়ি, বালি- তাদের ছায়া বিকেল হলে
ক্লান্ত হয়ে পড়ে আসে মাটির ওপর…

অথচ, কি তাজ্জব এই মাটিই, বলো?
এট কঠিন, এত স্থবির, এত রূঢ়,
সবার রোজের এই এত ভার বহন করেও
একটা কেউ নেই যে তার ছায়া নেয়!
মাটির ছায়া দেখেছ কখনও? কি একা না?

 

মা যখন থাকবে না

তুমি তো মা নও, তাই বোঝো না।
তুমি কেন, আর কেউই নয় তো, তাই বোঝে না।
তুমিও ভাবো, বেশ সুখে আছি।

সাগরের ধারে সেবার বেড়াতে গিয়ে
তুমি-আমি বালিতট ধরে
মাঝরাতে কতদূর হেঁটে গেছিলাম, মনে আছে?
কতদূর… কতদূর… তুমি নিষাদের তান ধরেছিলে!

ফিরতে ফিরতে ভোররাত হয়ে গেল প্রায়।
আসলে, আমরা হাঁটতে হাঁটতে এতদূর চলে যাই তো,
চলে যাই… চলে যাই… চলেই যাই কেবল…
তাই, বুঝি না।

মা হলে ঠিক বুঝত।
মা-কে খুব দেখতে ইচ্ছে করে যখন কিশোরী ছিল।
ছবিতে দেখেছি, বিনুনী করত।
মা থাকলে, আমি জানি, বালির ওপর একপাশে
বসে থাকত চুপচাপ… কিচ্ছুটি না-করে… স্রেফ ঢেউ গুনে গুনে…

তাই মা-রা বুঝতে পারে,
তাই মা-রা বুকে হাত বুলিয়ে দেয়।

মা এখানে এখন নেই তো, তাই,
থাকলে কি আর বুঝত না
কত কাল, কত বচ্ছর হয়ে গেল
ঘুম ভেঙে আর ভোরবেলা জাগি না আমি,
এখন কেবল, ধড়মড় করে ঘামে ভিজে গিয়ে
উঠে বসি রোজ, রোদ এসে পড়লে…

মা থাকলে ঠিক বুঝত।

আমি ভাবি, মা আর যখন সত্যি থাকবে না তাহলে
এটুকু বোঝবার কি আর কেউ থাকবে না?

 

শেষবার কবে

সুতরাং, ঘূর্ণন যদি সত্যি হয়ে থাকে, তুমি সরে যাচ্ছো নিজের থেকে।
নিজের ছায়া, স্পর্শ, গন্ধ থেকে।
মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের তলা থেকে,
তুমি কেবল তার সঙ্গে হোঁচট খেয়ে, ঠুকরে পড়ে, তাল রাখবার চেষ্টা করছ। পারছ না।

মাটির তবু ফেরার দায় থাকে, কিন্তু মেঘ?
যে মেঘ কাল দুপুরবেলা উড়ে যেতে যেতে, আড়চোখে শুধু দেখে নিচ্ছিল তোমায়,
সে তো ফিরবে না!

ছায়ারা দীর্ঘ-হ্রস্ব-বিন্দু হতে হতে ছাদের পাঁচিল, পাঁচিল-ঘেঁষা-কদমগাছ,
পুকুর-রাস্তা-রিকশা-গলি-বাজার-মেলা-পানের দোকান
কালোজামওলা-বেগুনী জিভ-কারেন্ট নুন
সবই খানিক ছুঁয়ে ছুঁয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে,
শৈশব-প্রেম-মায়ের কোল-শিল কুড়োনো পেরিয়ে, ছাড়িয়ে অন্তরীক্ষে… অন্তরীক্ষে।

অন্তরীক্ষ… যেখানে শুধুই পৌঁছোতে পারে বিমূর্তরা।
পোশাক, শোক, এমনকি ছায়া-– সব ছুঁড়ে ফেলে, কেবল আত্মা…
শেষ অবধি শুধু আত্মা পারে সেখানে যেতে।

কেবল আত্মা-– গোটা মহাকাশ তখন তার খেলার মাঠ, গোটা মহাকাশ পাঁচিল ছাড়া ন্যাড়া ছাদ।
গোটা মহাকাশ তখন তার চারদেওয়ালে-আয়না সেলুন
গোটা মহাকাশে সে শুধু তখন নিজেকে দেখে।
নিজের ছবি, নিজের ছায়া…
কঠিন কাজ! নিরাভরণ, বিবস্ত্রতায় নিজেকে চেনা সবচেয়ে কঠিন।

আর এখনও তুমি কেবল ভাবছ, সময় বুঝি একই আছে। আসলে নেই।
সব সরে গেছে। সেটাই নিয়ম।
শেষবার কবে আয়নার সামনে নগ্ন হয়ে
একা চুপচাপ নিজেকে ভীষণ খুঁটিয়ে দেখেছ, মনে পড়ে?