ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স। পূর্ণ সময় দিয়ে লেখালিখি। উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ফিচার সবকিছুই লেখেন। প্রথম ছোটগল্প প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকায়। প্রকাশিত উপন্যাস ‘কলাবতী কথা’। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ত্রিধারা’। একটি সংবাদপত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তৃতীয় উপন্যাস ‘দেউলপোতার আড়ালে’। প্যাপিরাস ই-ম্যাগাজিনের সম্পাদক।

রামধনু রং

একটা ফেসবুক গ্রুপে আলাপ হয়েছিল শমিতার সঙ্গে তিস্তার। বছর দুয়েকের ডিজিটাল ঘনিষ্ঠতা তখন উত্তুংগে। তারপরেই রিয়েল জগতের বন্ধুতার মাত্রা হঠাৎ করেই ছাপিয়ে গেল। এখন তারা একসঙ্গে ‘এলজিবিটিকিউপ্লাস’দের সভা সমিতিতে যায়। ফেসবুক পেজ থেকে তাদের কর্মকাণ্ডে সামিল হয়। কারণটা অন্যদের চোখে অন্যরকম হলেও মেয়ে দুটি খুব সিরিয়াস সেই সম্পর্কের ব্যাপারে। সেই মতো দুবছরের ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতার পর ওরা ঠিক করল উভয়ের পরিবারের সঙ্গে ভেট হওয়ার প্রয়োজন।

-এখনও কিসের সংশয় মা তোমাদের? ঠিক আছে আমরা সামাজিক বিয়ে নাহয় করব না কিন্তু আমাদের একসঙ্গে থাকার অনুমতিটা অন্তত দাও প্লিজ। আমরা শান্তি পাই তবে। শমিতা বলেছিল তার মা-কে।
বাবা নেমরাজি ছিলেন কিন্তু মায়ের বেশ আপত্তি এই থাকাথাকিতে।
-আজকাল কাগজে পড়ছ না? সমকামিতা বৈধ। দুটি মেয়ে বা দু’জন ছেলের মধ্যে বিয়ে এখন আকচার হচ্ছে আমাদের সমাজেও।
-সমকামী বিয়েটা ঠিকঠাক আইনত এখনও বৈধ নয় আমাদের দেশে, তবুও তোরা…মা এই বলে বারেবারে বাধা দিয়েছেন। বিরক্তিতে মায়ের ওপর প্রচ্ছন্ন ঘৃণা এসেছে শমিতার মনে।

তিস্তার মা বাবার সায় ছিল যদিও এই পার্টনারশিপে। তবুও দুটি মেয়ের থাকাথাকির পূর্ণতা প্রাপ্তি ঘটছিল না কিছুতেই।

দুজনের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি খোঁজার পালা এবার। চাকরি পেলেই একত্রে থাকবে তারা। তিস্তার বাবা বললেন ফ্ল্যাট কিনে দেবেন। সেখানে আলাদা সংসার পাতবে তারা। বাবা মায়েদের ঝুট ঝামেলায় থাকবে না। নিজেদের মতো করেই বাঁচবে তবে।

এরমধ্যেই ঘটে গেল খুব অস্বস্তিকর ঘটনা।

মেট্রোরেলের কামরায় দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে প্রকাশ্যে চুমু খেয়েছে সেটাই তাদের অপরাধ। আর তার জেরে শমিতা এবং তিস্তাকে নিয়ে প্রথমে চরম রঙ্গ মস্করা আর তারপর তাদের চলন বলন, পোশাক নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ শেষমেশ বেধড়ক পিটুনি। অশ্রাব্য গালিগালাজ করেল সহযাত্রীরা। শমিতা এবং তিস্তা যারপরনাই নাকাল সেদিন।

তাই বলে গায়ে হাত তুলবে? একে অপরের বিধ্বস্ত ছবি তুলে ফেসবুক ও হোয়াটস্যাপের এলজিবিটিকিউপ্লাস গ্রুপে পোস্ট করায় ভাইরাল হল সে ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায়।

পুলিশ বা প্রশাসন কেউ কোনও পদক্ষেপ নিল না এ ঘটনার। শমিতার বাবা, মানে যিনি মেয়ের এই সম্পর্ককে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছিলেন তিনিও সেদিন শমিতা বাড়ি ফিরতেই বললেন-
-আর পারা যাচ্ছে না তোমাদের নিয়ে। নিজেদের সংযত কর একটু। প্রকাশ্যে এসব ঘটনা ঘটানোর কোনও মানে হয়? কাল বাজারে গিয়ে মুখ দেখাব কি করে? কি প্রয়োজন‌ই বা ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে পোস্ট দেবার? ছেলেমানুষির একটা লিমিট আছে।
শমিতা বলেছিল,
-বাবা তুমিও? আমাদের একটু বোঝার চেষ্টা করো তোমরা।
মা অমনি বলে উঠেছিলেন, বেশ তো, এবার ঠ্যালা সামলাও। আশকারা দিয়েছ ওদের এবার বোঝো তার ফল। কত শখ ছিল আমার! একটা মাত্তর মেয়ের ঘটা করে বিয়ে দেব। আমার বিয়ের চন্দ্রহার, কানবালা ভাঙিনি। মেয়ের বিয়ের জন্য তুলে রেখেছিলাম। আমার সব ইচ্ছেয় এক ঘড়া জল ঢেলে দিলি তুই?
ভালোই তো মা। তিস্তা কে সাজিও তোমার গয়না দিয়ে।

-কি বললি তুই? একটা হিজড়ে ও।

শমিতা সেদিন অভিমান করে বেরিয়ে গেছিল বাড়ি ছেড়ে। ফিরে এসেছিল দুদিন পরে। এসেই বাবাকে বলেছিল টাকা দাও। আমারা সেক্স চেঞ্জ করে ফেলব। সব খোঁজখবর নিয়ে এসেছি।
বাবা ভয়ানক আপত্তি জানিয়েছিলেন।

-ওসব সেক্স চেঞ্জের সাকসেস রেট হাই নয়। গাদাগুচ্ছের খরচাপাতি করে যদি তোদের কোন ক্ষতি হয়ে যায়? আমরা বাঁচব না তবে।
শমিতা বলেছিল, সে তো আমার জন্য তোমরা এমনিতেই না মরে বেঁচে আছ বাবা। আমার জন্য মুখ দেখাতে পারছ না। অথচ আমার যে কি দোষ তা বুঝতে পারি না।

মা আরও তর্ক করলেন সেদিন। তুই বড় বেশি বুঝে গেছিস। বিয়ে থা হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস।
– কি ঠিক হবে মা? আমার এ যাবত কোনও ছেলেকে পছন্দ হয়না। আমি মেয়েদের সঙ্গেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আর সেই মেয়ে যে ঠিক আমাকে বুঝতে পারে। জীবনে যদি বিয়ে করি তো তিস্তাকেই করব। তোমরা এই কেমিস্ট্রি জীবনেও বুঝতে পারবে না। শমিতাও বেশ ঝাঁঝালো উত্তর দেয়।

– যাও বলিস তুই, তিস্তা মেয়ে নয়। তাহলে তোর প্রতি ক্রাশ হতনা ওর। আমরা তোর বাবা মা শমি। আমার তোর ভালো চাই। মা বললেন আবারো।

এবার শমিতা আর থাকতে না পেরে বলে ওঠে, আমিও তো মেয়ে নই মা। তোমরাই আমায় পৃথিবীতে এনেছিলে আর আমার দেহরসের টানাপড়েন তোমাদের মত নয়, এটা কেন বুঝতে পারছ না তবে?
বাবা সে যাত্রায় রণে ভঙ্গ দিলেন।
শমিতা বলে উঠল,

-ছোটবেলায় সব বন্ধুদের যখন অ্যাডলেসেন্স এসেছিল আমি তখন নিরুত্তাপ। আমার ক্লাসের বন্ধুদের বুক উঠছে সবেমাত্র। আমাকে ওরা জিগ্যেস করত, আমারও বুকে ব্যথা কিনা। দিনের পর দিন আমায় খেপিয়েছিল ওরা। তোমাকে বাড়ি এসে বলেছি কতবার। তুমি এড়িয়ে যেতে তখন। কেন মা বলবে?
মা চুপ করে রইলেন।

শমিতা আবারো বলে ওঠে প্রথম পিরিয়ডস হতে আমার মন খারাপ হয়েছিল খুব। তুমি খুব শান্তি পেয়েছিলে যেন। আবার সেই পিরিয়ডস অনিয়মিত হতেও ডাক্তার দেখিয়েছিলে মনে আছে মা? উনি তোমায় হরমোনের ফান্ডা দিয়েছিলেন। তুমি তখনও চুপ ছিলে। প্রকৃতির নিয়ম কে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলে। প্রচুর টেস্ট করে ডাক্তার বলেছিলেন আমি স্বাভাবিক মেয়েদের মত কখনোই হব না।
মা কেঁদে ফেললেন।

সেদিনও তুমি বাড়ি এসে খুব কেঁদেছিলে মা। কি করি বলত আমি? স্বাভাবিক মেয়ের জন্ম দাওনি শুনে বাবা সেদিন তোমায় পুরাণের ফান্ডা দিয়েছিল বিস্তর। মনে পড়ে মা? তুমি বলেছিলে চুলোয় যাক অর্ধনারীশ্বর, হরিহর, ইরাবানের গল্প। আমার পেটে এমন সন্তান হল? কি পাপ করেছিলাম আমি?
মা বললেন, তুই চুপ করবি শমি?

শমিতা বলে শোনো তিস্তার অবস্থা আরও সঙ্গীন। ওর দৈহিক গঠন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক তবুও ও পুরুষদের প্রতি এতটুকুনিও আকৃষ্ট হয়না। ও আমাকেই ভালোবাসে। আমার সঙ্গেই সারাজীবন থাকতে চায়। ওর বাবা মা’ র কথা ভাব একটি বার।
সেদিনের অত বাকবিতণ্ডার পর একটুও সময় নষ্ট করেনি শমিতা। পাড়ার স্টল থেকে কিনে এনেছিল “রূপ” নামের ম্যাগাজিনটি। সরকারি অনুদানে সদ্য প্রকাশিত এলজিবিটিকিউপ্লাসদের নিজস্ব ম্যাগাজিন।

শমিতার মায়ের চোখের সামনে তখন রঙ্গিন সেই রূপ ম্যাগাজিনের চকচকে খোলা পাতায় শমিতা এবং তিস্তার ছবি। সে পাতায় শুধুই রামধনুর সাত রং। ওদের লিভ ইন রিলেশনশিপের খবর বেরিয়েছে সেখানে। তাঁর ছেলে এখন নাম নিয়েছে শমী। যে নামে তিনি মেয়েকে এতদিন ধরে ডাকছেন।