Bhashanagar

বিকাশ দাশ

জন্ম ১৯৬৬ সালের পুরুলিয়া জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। মানভূম ভাষা নিয়ে গবেষণা করছেন। কয়েকটি সংকলন-গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। জীবিকা শিক্ষকতা।

ধানক্ষেতে ঢুলছে খামার

কিছু কিছু ঘুম চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে
ক্লান্তিরা ধান রুইছে নির্মাণের
আকাশ করুণা ঢালছে নিরন্তর
আর মাথার উপর উড়ে যাচ্ছে লক্ষ পৃথিবী ।
মেঘেদের সঙ্গম দেখে জলপাই রঙের গাছেরা
হস্তমৈথুনে উড়িয়ে দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ সন্তান
একটা মৃত মানুষ হাসছে কবরের উপর আজান দিতে দিতে।

নৈঃশব্দ্যের ভেতর হারাচ্ছে ক্ষণকাল
আমাদের কোন গন্তব্য নেই
পথগুলো সব তুলে নিয়ে গেছে অসংযম
কচি কলাপাতার মতো সবুজ ধান গাছ
তখনও ভবিষ্যের ভাগ্য লিখছে।
কাদা জলে চুপ শুয়ে আছে আকাঙ্ক্ষা
একদিন খামারে বাজনা বেজে উঠবে
ঘুমেরা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে
তারা শূন্যের মতো গোল হয়ে কণ্ঠে তুলে নেবে ঝুমুর।

ধান খেতে দাঁড়িয়ে আছে আস্ত খামার
ক্লান্ত মানুষের ছায়ায় নেচে উঠবে শস্যখেতের অহংকার ।

 

বালিশ বিসর্গ হলে 

এপারে আমার শরীর
আর ওপারে তোমার শরীর পেতে রাখি
আমাদের মাঝখানে একটা বালিশ
কেমন বিসর্গ হয়ে থাকে।

দন্ত বর্ণের তৃতীয় ও কণ্ঠ বর্ণের দ্বিতীয়
আমি ও তুমি আর আমাদের দাম্পত্য।

আমরা চুপ শুয়ে আছি
কিছু সন্তাপের উপর তা দিয়ে,
বালিশের কোনও তাপ নেই; কেবল অসূয়া
ঠিক ততটাই ক্যামোফ্লাজ অসুখ
ঠিক যতটা অন্তর্ভেদী।

এপাশে আমি আর ওপাশে তুমি
মাঝখানে বালিশ অযোগবাহ হয়ে খেলছে কৃপণ
দুঃখ বললে ততটা দুর্বোধ্য লাগে না
বালিশ কেবল বিসর্গ হয়ে দুঃখ বোনে
আমাদের রাত কাঁথায়।

 

সম্পর্ক ৩

এবং আমাদের চেনা-জানাগুলি
আরও বেশি আলোকিত হতে পারত
আমাদের ভাল লাগা মন্দ লাগার কারণগুলি
আরও স্পষ্ট ও লঘু হতে পারত।

তোমাকে তেমন করে দেখা হবে না
জানা হবে না–
কোনও উৎসবে তোমার বাণী মাঠে ফসল ফলাবে।

তুমি কী জানতে চেয়ছিলে
আর আমি কী জানাতে পেরেছি
এই ভাবনায় মুখোমুখি চেয়ে উড়িয়ে দিই সম্পর্কের বীজ।

ভেতরে ভেঙে গেলে
মানুষের বাইরেটার কি দাম থাকে বলো?
কেবল বেঁচে থাকা নিঃসাড় শরীর
বয়স ফেলে রেখে যাচ্ছি ধূলোয়
পাতায় ভাসানোর যে সুর বেজে ওঠে।
আমরা একই ভাবনায় চেয়ে থাকি পরস্পর।

 

আমার বৃক্ষপুরুষ

আমাদের একটা নিজস্ব ঘর ছিল, তালপাতার।
বৃষ্টি দিনে সারা ঘর থই থই
উঠোন জুড়ে পুঁইমাচা, ঝিঙেফুল, তুলসীমঞ্চ
ভেষজ গন্ধে ম ম করা হৃদয় নিয়ে
এককোণে বাবা ঘোরাতেন পাটের লাটাই
মাঝে মাঝে গাইতেন দোঁহা থেকে গান।
সকাল বিকেল ধানমাঠে কোদাল লাঙল
বাবার চাটানো বুকে নিরাময় ঘুমাতাম
সারা ঘর বাবার ঘামে ভেজা গেঞ্জির গন্ধ
বাবা আমার বৃক্ষপুরুষ, আমার ঈশ্বর
নিরক্ষর, তবু আওড়াতেন
অনর্গল রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ।
যে মোষ চরানো জীবন ছুঁয়েছিল শৈশব
সেই মোষই একদিন লিখেছিল শেষ ঠিকানা।
এত শিক্ষিত মানুষ তেমন দেখিনি
ভাগের সংসারে অদ্ভুত ব্যালেন্স করে চলতেন
আামাদের চার ভাইয়ের গলগ্রহ হননি কোনওদিন।
যে কাজ জীবনভর ভালোবাসা
সেই কাজের মধ্যেই লিখলেন পরপার।

Bhashanagar