Bhashanagar

ব্রাইটেন ব্রাইটেনবাখ | জন্ম ১৯৩৯

কেপটাউন থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ আফ্রিকার বোনিভাল গ্রামে জন্মেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় কারাদন্ডে দণ্ডিত হন। এই অঞ্চলের আফ্রিকানস-ভাষী দক্ষিণ আফ্রিকানরা তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় কবি হিসাবে ঘোষণা করেছেন। তিনি ফরাসি নাগরিকত্বেরও অধিকারী।

বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে তার বিরোধিতা ও কাজ তাকে ষাটের দশকের গোড়ার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে প্যারিসে চলে যেতে বাধ্য করেছিল। সেখানে তিনি ভিয়েতনামের বংশধর এক ফরাসি মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন এবং মিশ্র বিবাহ নিষিদ্ধকরণ আইনের ফলে সে সময়ে দেশে ফিরে যেতে পারেননি।

১৯৭৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় গোপন পরিব্রজনের অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং উচ্চতর দেশদ্রোহিতার দায়ে নয় বছরের কারাদন্ড দণ্ডিত হন। The True Confessions of an Albino Terrorist বইটিতে তিনি তাঁর কারাবাসের বর্ণনা দিয়েছেন। ১৯৭৭ সালে আরো কিছু অপরাধের জন্য তাকে দণ্ডিত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার বিশেষ কিছুই প্রমাণ করা যায়নি। কারাবাসের সময়, ব্রাইটেনবাখ “Ballade of Unfaithful Lover” কবিতাটি রচণা করেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের ফলস্বরূপ ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে ব্রাইটেনবাখ প্যারিসে ফিরে আসেন এবং ফরাসী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৯৪ সালে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল পার্টির পতন ঘটে এবং বর্ণবাদ সমাপ্ত হয়। ব্রাইটেনবাখ জানুয়ারী ২০০০ সালে কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হন। এছাড়া তিনি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ের ক্রিয়েটিভ রাইটিং শেখানোর সাথেও জড়িত।
ব্রাইটেনবাখ বিরচিত উপন্যাস, কবিতা ও প্রবন্ধের অনেকগুলিই আফ্রিকানস ভষায় লেখা। তার অনেকগুলি আফ্রিকানস থেকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। তাছাড়া কিছু ইংরেজিতেই প্রকাশিত হয়। তাছাড়া ব্রাইটেনবাখ চিত্র-শিল্পের জন্যও পরিচিত। তাঁর চিত্রকর্ম এবং প্রিন্টের প্রদর্শনী জোহানেসবার্গ, কেপটাউন, হংকং, আমস্টারডাম, স্টকহোম, প্যারিস, ব্রাসেলস, এডিনবার্গ এবং নিউ ইয়র্ক সিটি সহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হয়েছে।
পুরষ্কার: জিবিগিনিউ হারবার্ট আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭।

ভাষান্তর | রূপক বর্ধন রায়

বিদ্রোহী গান

আমায় একটা কলম দাও
যাতে আমি গাইতে পারি
যে এ জীবন নিরর্থক নয়

আমায় একটা ঋতু দাও
খোলা চোখে আকাশ দেখার
একটা শরত একটা বসন্ত
একটা পীচ গাছ যখন তার প্রাচূর্য বমন করে
পৃথিবীর বুকে স্বৈরশাসন নামবে

মায়েদের বিলাপ করতে দাও;
নীরস হয়ে যাক স্তন
আর জঠর কুঁচিত হোক
যখন ফাঁসির মঞ্চ নিজের সন্তানদের দুধ ছিনিয়ে নেবে

সেই প্রেম দাও আমায়
আঙুলের ফাঁকে যার পঁচন ধরে না,
আমার কামী
এক প্রেম দাও যেমন এ প্রেম যা আমায় তোমায় দিতেই হবে,

একটা হৃদয় মঞ্জুর করো
যা অন্ধকারে সন্ত্রস্ত একটি পায়রার
সাদা ঠোকরানো হৃদয়ের থেকেও
দৃঢ়তর ভাবে স্পন্দিত হবে
তিক্ত গুলির থেকেও আরো প্রবলভাবে আঘাত করবে।

একটা হৃদয় প্রদান কর
পরম সুখ প্রস্ফুটনের জন্য
ছোটো রক্তের ফোয়ারা
কারণ রক্ত কখনই অকারণ নয়।

যখন আমার হৃদয় তখনও উর্বর এবং রক্তিম
সংশয়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন মাটি আমি খেয়ে ফেলার আগেই
আমার মৃত্যুর আগেই আমার মৃত্যু প্রয়োজন

আমায় দুটো ঠোট দাও
আর জিভ দিয়ে ধরিত্রীকে
ক্ষমার দুধে ফুলে ওঠা
একটা অসীম প্রেমপত্র লেখার জন্য উজ্জ্বল কালি

দিন থেকে দিনে মিষ্টতর
সমস্ত তিক্ততা ঝরানো
গ্রীষ্ম যেমন পুড়ে মিঠে হয়
তেমন জ্বলন্ত

তবে বিভ্রান্তি বা দাঁড়কাকহীন
গ্রীষ্মই হতে দাও
ফাঁসিকাঠকে অনুমতি দাও সে পীচ গাছটিকে
তার সন্তুষ্টির রক্তিম ফল অর্পন করুক

আর আমার জন্য প্রায়শ্চিত্তের পায়রার
এক প্রেমের গান মঞ্জুর কর
যাতে আমি আমি গাইতে পারি আমার জীবন বিফলে যায়নি

আকাশের নীচে
খোলা চোখে
যখন আমার মৃত্যুর হবে
আমার রক্তিম গান মিথ্যে বলবে না
আমার রক্তিম গানের কখনও মৃত্যু হবে না

 

তোমার চিঠি

স্বপ্ন যখন এক বাগান
তখন তোমার চিঠি একটি ফুলের থেকেও
বৃহত্তর ও হালকা-

তোমার চিঠি খোলার সাথে
প্রশস্ত আয়তা, বাইরের শব্দ, আকাশের এক
উন্মচন হয়

আমি সবুজ প্রান্তরে ঘুমিয়েছি,
রাত্রি শেষ প্রহরে
পৃথিবীর অভ্যন্তরীন সুরঙ্গে আগুয়ান
মৃত্যুপথযাত্রীদের শুনতে শুনতে
আমি মৃত্যু-ছায়া উপত্যকার শিখরে শুয়ে থেকেছি,

ঠোটের গোড়ায় নিশ্বাস নিয়ে
ওরা কিভাবে গান গায়,
একটা জ্বলন্ত শহর
ছেড়ে যাওয়ার মুখে বাসিন্দার মত, ওরা কিভাবে গায়,
শিকলের মত ওদের নিশ্বাস,

আমার শত্রুদের উপস্থিতিতে আমার সামনের টেবিলটা
খালি, আমার মাথা ভর্তি ছাই,
আমার কাপ খালি

এবং আমি সূর্যের সাথে উন্মচিত
সাদা ফুলে সাজা কমলালেবু গাছটার কথা পড়তে
তোমার চিঠির কাছে পালিয়ে গিয়েছি

আমি বারান্দায় গন্ধটা পাচ্ছিলাম-
আমি তোমার গন্ধ পাচ্ছি
এই বিরক্তিকর রাতে যা একটা ফুলের চিন্তার চেয়েও
সুন্দর ও হালকা

আমি তোমার শব্দের আকাশ থেকে ঝুলে থাকবো-
মঞ্জুর কর আমি যেন আমার জীবনের সমস্ত দিন
তোমার চিঠিতে আবাস পাই

প্রেরণে
তোমার চিঠি সুন্দর, স্বপ্ন যখন বাগানের মাটি
তখন তা একটি ফুলের ভাবনার থেকে
বৃহৎ ও হালকা

তোমার চিঠি খোলার সাথে
স্মৃতি, বাইরের শব্দ, আকাশের
উন্মচন হয়

 

এক জ্বলন্ত সমুদ্রে

কত অকসর আমরা মেঝের উপর ঠাণ্ডায় আবৃত
ছিলাম
তার্পিন আর আগুনের গন্ধ
ক্যানভাসগুলো আমাদের রিক্ত চোখে সাদা দেখায়
রাত্রির উদাসীনতা
আর চাঁদ দৃষ্টির অন্তরালে কোথাও একটা
হাসি
ঋতুর মত শার্সির পিছনে দিনগুলোর পচন ধরে
বৃষ্টির পাতাগুলো, একটা মুখ, একটা মেঘ, এই কবিতা
আমি তোমার মাঝে আমায় আঁকতে চেয়েছিলাম
চেয়েছিলাম একাকিত্বের জ্বলন্ত সময়ে তোমায়
চিহ্নিত করি
তোমার নড়াচড়ার রুপোলি ছায়া আর
তোমার নিরাশ শরীরের মত
কোনো আগুনের সঙ্গীত এত স্পষ্ট নয়
আমি তোমার সেই বিষাদ শুষে নিতে চেয়েছিলাম
যাতে তুমিও প্রতিভাত হতে পারো
যেভাবে পায়রা ও গাছেদের আগুনে ভরা একটা শহর
একটি উজ্জ্বল ভুদৃশ্যে প্রস্ফুটিত হয়
আর রাতের অদৃশ্য রুপোলি কাকও
আর চাঁদটা একটা মুখ যাতে কেউ আঁচ ধরাতে পারে
আর তারপর আমি আশায় ছিলাম তুমি হাসবে
আর তোমার তেতো শরীর
তোমার নিতম্বে আমার চিনেমাটির হাত্
তোমার নিশ্বাস একটা আঁধার-কৃষ্ণাভ ব্যাথা
আমার কানের কাছে একটা তরোয়াল
কত অকসর আমরা এখানে ছিলাম
যেখানে শুধুই রুপোলি ছায়া নড়াচড়া করে
শুধু তোমার মাঝেই নিজেকে অস্বীকার করতে পেরেছি
শুধু তোমার মাঝেই জেনেছি একটা জ্বলন্ত সাগরে আমার
কোনো বন্দর নেই

Bhashanagar