Bhashanagar

ফরুগে ফারুখযাদ

নারীদের মধ্যে ইরানের সবথেকে প্রভাবশালী কবি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় ফরুগে ফারুখযাদকে (فروغ فرخزاد )। তিনি একাধারে কবি এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন। সামাজিক অনেক প্রথার বিপরীতে কথা বলার কারণে তিনি তার সময়ে বিতর্কিত হয়েছিলেন। ইসলামী বিপ্লবের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফারুখযাদের কবিতা নিষিদ্ধ ছিল।
১৯৯৯ সালে আব্বাস কেয়রোস্তামি তার বহুল প্রশংসিত চলচ্চিত্র ‘বদ ম র খহাদ বোর্দ’ বা ‘The Wind Will Carry Us’ সিনেমার মাধ্যমে ফরুগে ফারুখযাদকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তোলেন— চলচ্চিত্রটির নাম ফারুখযাদের একটি কবিতার শিরোনাম থেকে নেয়া এবং সিনেমার মধ্যেও এই কবিতাটি রাখা হয়েছে।
ফরুগে ফারুখযাদ ১৯৩৫ সালে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মোহাম্মদ বাঘের ফারুখযাদ পেশায় ইরানের সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। স্কুলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ১৬ বছর বয়সে সেই সময়ের তেহরানে বেশ পরিচিত স্যাটায়ারিস্ট পারভিজ সাপুরের সঙ্গে বিবাহ হয়। মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

ভাষান্তর | অহ নওরোজ

অন্যায়

প্রচুর আনন্দে আমি গোনাহ করেছি
যেন একটি জ্বলন্ত আর উষ্ণ আলিঙ্গনে
অস্ত্রের ভেতরে থেকে আমি গোনাহ করেছি
যেখানে কেবল ছিলো দারুণ কঠিন বাস্তবতা।

সেই অন্ধকার আর নিস্তব্ধ নির্জনতায়
দেখেছি রহস্যে-ভরা চোখ তার
আর কামুক চোখের অনুরোধে
অধীরভাবে আমার বুক আর
তার নিচে কেঁপেছে হৃদয়।

সেই অন্ধকার আর নিবিড় নির্জনতায়
তার নিকটে বসেছি চুলগুলো খুলে—
ঠোঁটের আবেগ টলে পড়েছে আমার ঠোঁটে
আর হৃদয় আমার বেঁচে গেছে সব দুঃখ থেকে।

প্রেমের গল্প ফিসফিস করে বলেছি তার কানে:
তোমাকেই চাই আমি, হে জীবন
তোমাকেই চাই আমি, হে আমার ভালোবাসা-স্পর্শ
হে প্রেমিক প্রিয়তম, তোমাকেই চাই।
আকাঙ্ক্ষায় জ্বলে উঠেছে চোখেরা
পেয়ালায় নেচেছে রঙিন মদ
নরম বিছানায় দেহ আমার
মাতাল কেঁপেছে তার বুকে।

প্রচুর আনন্দে গোনাহ করেছি আমি
কাঁপুনির পাশে পাশে অবাক শরীরে।
হে খোদা, কে জানি কী করেছি
সেই অন্ধকার আর নিবিড় নির্জনতায়!

 

বাতাস আমাদের নিয়ে যাবে

হায়রে আমার ছোট্ট রাতে
গাছেদের মিষ্টি ঘুম নিয়ে
ঝড় যে কী ঘটাবে!

হায়রে আমার ছোট্ট রাতে
জমে থাকা ধ্বংসের ভয়
স্রোতের মতন বয়ে যায়।

শোনো
ছায়াগুলো এগিয়ে চলছে…
আমাদের পালাতেই হবে।

সুখগুলো আমার কাছে অদ্ভুত লাগে
আমি যেন হতাশায় পড়ে গেছি,
মনে হচ্ছে স্নিগ্ধ রাত ঘিরে
ভেসে থাকা সব শান্তি
তছনছ হয়ে যাবে।

শোনো
ছায়াগুলো এগিয়ে চলছে…
আমাদের পালাতেই হবে।

তুমি কী দ্যাখো না?
ছাদেরা কাঁপছে, পড়ে যাবে যেন
তার উপরে মেঘেরা মেলে আছে ঘন কালো
যেন নিস্তেজ, শোকার্ত জনতার মতো
কেঁদে ফেলবে এখনিই।

তুমি কি শোনো না—
জানালার ধার ঘেঁষে মার্চপাস্ট করছে রাতেরা
আর বাতাসেরা আমাদের উঠানের নিশ্বাস ভাঙছে।
যেনবা অচেনা কোনো চোখ
দেখছে আমাদের বাড়িটি ।

শোনো
ছায়াগুলো এগিয়ে চলছে…
আমাদের পালাতেই হবে।

পাতাদের সবুজ দেহের মতো—
ওগো তুমি
হাতে হাত রাখো, আঙুলে আঙুল
ধরে রাখো গনগনে আদরের স্মৃতি ভেবে।

পাতাদের সবুজ দেহের মতো—
ওগো তুমি
তোমার জিভ দিয়ে ঘাই মারো আমাকে
স্বাদ নাও পুরনো মদের কড়া ঘ্রাণের মতন।

আমরা যদি ভুলে যাই
বাতাস আমাদের নিয়ে যাবে,
বাতাস আমাদের নিয়ে যাবে।

তরঙ্গ

আমার কাছে তুমি এক ঢেউ
এখানে কিংবা ওখানে—
যেন তুমি কোথাও নেই।

তবু মনে হয়
জোর করে টেনে নিয়ে
অধিকার করছো আমাকে—
মারাত্মক প্লেগের মতো
দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছো সারাদেহে।

তবু কিছু পরে যেনবা পালিয়ে যাও—
কোনো অস্পষ্ট গন্তব্যে।

তোমাকে অনেক দেখি
দূর থেকে হাওয়া-শরীরে—
এই ভরা চোখে
দারুণ জোয়ার হয়ে ওঠো
নিয়ে যাও কোনো অনন্তের পথে।

হৃদয় নরম করে রেখে
একবার হিংস্র হয়ে আসো—
আমি জানি,
কেবল তুমি বেড়ে উঠেছো আফসোসের সমুদ্রে।

তুমি এক অবারিত জোয়ার
ভেসে চলো সারাক্ষণ
নিয়ে যাও কোনো অনন্তের পথে।

একদিন কোনো রাতে
মুখোশ পরেই বের হবো
আকাঙ্ক্ষার কোনো দূরবর্তী নদী উপকূলে
আর্দ্র বালি হয়ে বন্দি করবো তোমাকে—
চিরকাল সরিয়ে রাখবো
সবকিছু থেকে দূরে।

 

সওগাত

রাতের গহিন থেকে কথা বলি
দূর কোনো গাঢ় অন্ধকার থেকে—
কথা বলি গহিন রাতের ভেতর থেকে।

যদি তুমি বন্ধু এখানে আসো আমার ঘরে
লালনীল পিলসুজ
অথবা জানালা এনো যদি পারো—
সুখের গলিতে বেড়ে ওঠা ভিড়ে
যেন কিছুটা মেলতে পারি চোখ।

পাখি হয়তো-বা মরে যাবে 

কষ্ট হচ্ছে আমার
নীল হয়ে যাচ্ছি

নিঝুম রাতের মসৃণ খোলসের উপর
ঘষেছি হিম আঙুল—

যাতায়াতের সকল পথ অন্ধকার হয়ে আছে
আমাদের কাছে এসে সব গলি
বিশাল পরিখা হয়ে গেছে।

রোদেরা হারিয়ে গেছে বহুদূরে,
ঘুঘুদের ভিড় মুছে গেছে সবখানে।

ঝাঁকের কথা মনে ভেবে
পাখি হয়তোবা মরে যাবে।

Bhashanagar