Bhashanagar

গীতা ত্রিপাঠী | জন্ম ১৯৭২

নেপালি কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেপালী বিভাগের অধ্যাপিক। বিভিন্ন সংবাদপত্রে পরিবেশ, নারী অধিকার এবং সামাজিক অবিচার নিয়েও নিয়মিত লেখালিখি করেন। নেপাল সরকার তাঁকে Padmakanya Gold medel- 2000 সম্মান দিয়েছে। ২০০৮ সালে Best Lyricists Award পেয়েছেন। কাঠমান্ডুতে বসবাস করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল Nrishamsha Parkhalharu (नृशंस पर्खालहरू) Dui Haraph Othharu (दुई हरफ ओठहरू) Simalko Geet (सिमलको गीत)

ভাষান্তর | ওয়াহিদা খন্দকার

মাঝবয়সী উপলব্ধি

হালকা করে নিলাম,
আমার মায়ের বোঝা
অর্ধেক বয়স কাটানোর পর
উপলব্ধি করলাম, জীবনটা ভারী।

দূর থেকে দেখলে
মাকে ফুলের মতো উজ্জ্বল মনে হত।
তার চোখের পাতার দোরগোড়ায়
চাঁদ সমসময়ই হাসত।
আর ডানার মতো চঞ্চল হয়ে ওঠত ।

আমি জানি না মা কিভাবে উড়তে পারত।
তার স্বপ্ন ছিল বর্ণিল ঘুড়ির মতো।
অথচ কখনোই ঘুড়িটা ওর হাত থেকে পড়ে যায়নি।
এমনকি তার সুতো ছিনিয়ে নেবার জন্য
পাখিরা তার চারপাশে উড়ে বেড়াত।

মা আমাদের ঘর সাজাতেন নিজস্ব সুর -ছন্দে
তাই একটা অতুলনীয় স্বপ্নের বাগান তৈরি করতে পারতেন তিনি।

তার উপস্থিতি আমাকে জাগিয়ে তোলেনি কখনো
কখনো জিজ্ঞেস করিনি যে
তোমার কপাল পথ কতটা দূর বিস্তৃত?
বলিনি, এটা কি তোমার ব্যথা?
আবার এও বলিনি, আমি কি তোমার ভার পারি?

অনেক দিন আগে, একটা সুন্দর দিনে
কচি বয়সে
মা তার বোঝা নামিয়ে রেখেছিল
সমস্ত স্বপ্ন ও সাধসহ।
আমার পুরনো মা যখন বোঝা নামিয়ে রাখতেন
আশা করি তখন সারা বাড়িতে,
ছাদের নীচের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত, অলস পায়রা।
ঠিক যেন তার উত্তেজিত গানের মতো।

আজ যদি মা তার বোঝা নামিয়ে রাখে
তাহলে আশাহীনতা ঘিরে ধরে,
ভয়, দুঃখে আর অপরাধবোধে
ক্লান্ত হয়ে আসে ঘরের দেয়াল

আজ চেষ্টা করছি বোঝাটা তোলার
মা যেটা তুলেছিল একদিন।
কোন পুরুষ হিসেবে নয়
একজন নারী হয়ে চাই।
মায়ের ভার বহন করতে।
অনেকটা রামের শিবের ধনুক তোলার মতো।

পুরুষত্ব পারে না।
অন্য প্রজন্মের পথে,
মায়ের মতো সঠিক যাত্রা করতে

 

অবিচ্ছিন্ন

যখনই মনে পড়ে তোমাকে
আমার কবিতাগুলি গান হয়ে যায়
আর তোমার দিকে ছুটে যেতে থাকে।

তোমার কেন্দ্র ও আমার পরিধির মধ্যে সময়ের অসীম দূরত্ব এখন।
তবু মনেহয় হয়,
যুগ যুগ ধরে বিশ্বাসের একটানা নদী প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
যতক্ষণ পর্যন্ত জল আছে
ততক্ষন দুটি কিনারা একে অপরের সাথে থাকে জুড়ে থাকবে স্থায়ী সময়ের জন্য।

স্মৃতিচারণের পুরো তরঙ্গ বাড়িয়ে দিয়ে,
আমি, যে কিনা একই সময়ের যাত্রী।
অপেক্ষা করতে থাকব
তোমার গানের সুরের জন্য
ঠিক একই নদীর তীরে… অবিচ্ছিন্ন…

 

আপাতবিরোধী

 আমি যুক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না
যে ফুলদানিটা পড়ে গেছে সেটা তোলা উচিত কিনা
নাকি ওটা যেমন আছে তেমনই ছেড়ে দেয়া উচিত

যা পড়ে গেছে তা এক ধারাবাহিক ভাঙা বিশ্বাস।
আবার সবটা জোড়া দেয়াও খুব কঠিন
এই ফুলদানি থেকে
একটি পুরো যুগ আজ বেরিয়ে পড়েছে।

আমি মাটিতে প্রায়ই শুনতে পাই, অসংখ্য শিশুর কান্না
অসংখ্য মায়ের হাহাকার।
এই ফুলদানিতে আমি দেখতে পাচ্ছি সৃষ্টির কদর্য রূপ।
হাজার ভ্রূণের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে
আমি হলুদ সন্ধ্যা জ্বালিয়ে দিই,
এবং দাঁড়িয়ে স্থির নীরব সময়টাকে দেখি।

এই ফ্যাকাশে মধ্যবিরতিতে
আলো এবং অন্ধকারের মধ্যে
অনেক ক্ষতের রক্তে ফুল ফোটে,
সমস্ত আশা এবং বিশ্বাসের বিরুদ্ধে,
একটা বিপরীত ভঙ্গিতে।

পতিত ফুলদানি
এবং ভাঙা ফুলগুলি
তাই শুধু ফুল এবং ফুলদানির সাথে সম্পর্ক রেখো না

 

চিয়ার গার্লস এবং ভিড়ের মুখগুলি

স্টেডিয়ামের উপরের প্যারাপেটে দাঁড়িয়ে
আমি ক্রিকেট খেলা দেখছি।
এবং ভাবছিলাম:
এই উন্নয়নশীল দেশে
কোথা থেকে এই চিয়ার গার্লগুলি আসে?
কোথায় তাদের মিথ্যা দেশীয় ভূগোল ?
এবং আমি তাদের উচ্ছৃঙ্খলতায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ি

তাদের পিচে যাওয়ার অনুমতি নেই
হাত পা নড়াতে শুধু অল্প পরিসরে
তাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তাদের মাঠে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয়েছে
অবাধ্য হতে বা সাহস দেখাতে তারা ভয় পায়।

তাদের হাতে কয়েক ডজন শেকল
কর্কশ শব্দে এখনও তাদেরকে বেঁধে রাখে
এবং তারা ক্রিকেট বলকে ভয় পায়
তারা তাদের নির্ধারিত জায়গা থেকে নড়তে ভয় পায়
তাদের হাত, নখ স্নেহপূর্ণভাবে ম্যানিকিউর করা
তারা মনে করে যে তাদের হাতগুলি ভঙ্গুর, খুব সূক্ষ্ম,
তারা মনে করে!

তারা কি শুধুই স্থুল ছদ্মবেশী?
বা পোস্ট মার্কসবাদের একটি চিহ্ন
যে কিনা দর্শনের মধ্যে মানানসই নয়
নাকি পুঁজিবাদের আর একটি মুখ?
কে জানে
তাদের শ্রম কেনা হচ্ছে নাকি তাদের সৌন্দর্য,
তাদের ভাগ্য বিক্রি হচ্ছে নাকি তাদের শিল্পসত্তা?

এর সমস্ত প্রকাশ ক্ষুধার নামে
এই প্রফুল্ল মেয়েরা পুরুষদের অনাবিল আকাঙ্ক্ষাকে ঘৃণা করে
আমি ভাবছি সকল দর্শকদের মাঝে
তাদের প্রাসঙ্গিকতা কী
খেলোয়াড়দের জন্য তাদের প্রয়োজনীয়তা কী?
কে জানে যে এই চিয়ার গার্লের “ইসম” কি?
এই উত্তর-উপনিবেশিক সংস্কৃতিতে তার সম্বন্ধ কি
বা তাদের সীমাবদ্ধতাই বা কি?

প্রতিটি বাউন্ডারি শট এবং সিক্সার সহ, তারা আনন্দ করে
এই নতুন অবতারেরা পুরনো স্কুলের নিম্নপদস্থ সেনাপতি বিশেষ
তবে তারা কোথাও নেই
সমস্ত শক্তি দিয়ে তারা উল্লাস করে
কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর কতদূর পৌঁছায় ?

স্টেডিয়ামের বাইরে, দূর রাস্তায়
মিছিলে সমর্থকরা উন্মত্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে
উগ্র বন্য দলের চিৎকার নিয়ে
নিজেদের সঠিক প্রতিনিধি ঘোষণা করতে করতে

আমি দেখছিলাম।
স্টেডিয়ামের উপরের প্যারাপেটে দাঁড়িয়ে
তাদের আনন্দ দেখে হতবাক।

Bhashanagar