Bhashanagar

রূপা ভবানী | (১৬২৫-১৭২১)

একজন মরমী সাধক ও কবি। শ্রীনগরের সাফা কাদল অঞ্চলে এক শিক্ষিত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা পণ্ডিত মাধব জু ধর। তিনি অলকেশ্বরী ও সাহিব নামেও পরিচিত। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ঝোঁক ছিল আধ্যাত্মিকতার দিকে। সেই সময়ের রীতি অনুযায়ী যদিও তার বিয়ে হয় সাত বছর বয়সে, অল্পদিনের মধ্যেই তিনি পিতার গৃহে ফিরে আসেন।বাবা তাকে সাদরে গ্রহণ করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রতি তাঁর বাবার ছিল অগাধ আস্থা। এরপর তিনি বিভিন্ন নির্জন স্থানে বহু বছর ধরে কঠোর সাধনা করেন এবং সিদ্ধিলাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর একনিষ্ঠ শিষ্যদের কাছে তাঁর সাধনপথের অভিজ্ঞতা ও মহাজাগতিক চেতনার কথা কাব্যিক উচ্চারণ বা ‘বাখ’-এর মাধ্যমে বর্ণনা করেন। ‘বাখ’ কাশ্মীরের একধরনের কবিতার রূপ যা সাধারণত চার পঙক্তির হয়ে থাকে। চতুর্দশ শতাব্দীর সন্তকবি লাল দেদ্-এর বাখগুলি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। রূপা ভবানীর আধ্যাত্মিক কাব্য ‘রহস্যপোদেশ’। যেখানে তিনি প্রাথমিক দার্শনিক প্রশ্নগুলি উপস্থাপন করেছেন: জীবনের উদ্দেশ্য, কীভাবে সুসাম্য স্থাপন করা সম্ভব ব্যক্তিমানুষের মূল উপাদানগুলি—দেহ,মন,আত্মা,আবেগের ভিতর। তিনি বলেছেন দেহের সীমাবদ্ধতা দূর করে কীভাবে আধ্যাত্মিক মুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব এবং লাভ করা সম্ভব প্রগাঢ় শান্তি।পুরোনো কাশ্মীরি, সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষার মিশ্রণে রূপা ভবানীর বাখগুলি রচিত। যে কারণে তাঁর বাখগুলি কেবল দীক্ষিত পাঠকের আগ্রহের বিষয় হয়ে থেকেছে।সাধারণের কাছে দুর্বোধ্য হওয়ার কারণেই তাঁর বাখগুলি সাধারণের দ্বারা গীত হয়ে কাশ্মীরবাসীর মৌখিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠেনি। রূপা ভবানী সুফিসাধকদের সাথে নিয়মিত আধ্যাত্মিক আলোচনা করতেন।বেদ,উপনিষদ, বেদান্ত,শৈবদর্শনে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। তিনি তাঁর কবিতায় মানুষের সৃষ্ট জাতপাতের বিরুদ্ধে বলেছেন। চাষবাস ও নদীপথে যাতায়াত—কাশ্মীরের এই অতি পরিচিত চিত্রের মেটাফোর ব্যবহার করে তিনি জন্মসূত্রে উচ্চতার ধারণার অর্থহীনতাকে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, পরমেশ্বর যিনি জীবাত্মাকে পৃথিবীর ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সাগর পার করে দেন, যখন তাঁরই কোনো বর্ণ, রূপ, গোত্র নেই, তখন আমরা সামান্য মানুষ কীভাবে এই ভেদাভেদ আরোপ করতে পারি। কাশ্মীরি পণ্ডিত সমাজের অনেক কুপ্রথা তিনি দূর করেছিলেন। ধর্মের বাহ্যিক আচার ও রীতিগুলিকে তিনি বর্জন করেছিলেন।

অনুবাদ ও অনুষঙ্গ | সায়ন রায়

নির্বাণ দশকী


স্মরণ করো সেই সহজ সত্তা, সর্বত্রব্যাপী
শাশ্বত, সর্বভূতে বিরাজমান, তোমার বন্ধু
সর্বশক্তিমান, অদ্বিতীয়, স্বয়ম্ভু, যাঁর রূপ সর্বোত্তম
দৃষ্টি দাও অন্তরে,আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।

সহজ—তান্ত্রিক যোগের একটি পরিভাষা। যার অর্থ স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত, আদি অবস্থা ও সত্তা।


বিশুদ্ধ চিত্তে মূলাধার হতে জাগাও কুণ্ডলিনী, শুভ্র মণ্ডলাকার
উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে,সকল চক্রের মধ্য দিয়ে, চেতনার সকল স্তরে থাকো অবিচল
নিমজ্জিত হয়ে দৈব-চৈতন্যে, চেতনার সকল অবস্থার বাইরে,অন্তহীন আনন্দে!
দৃষ্টি দাও অন্তরে,আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।


সেই সুন্দর, শাশ্বতজন, সর্বোচ্চ অবস্থা প্রদানকারী, সর্বসৃষ্টির মধ্যে প্রবাহিত
সকলকে দেন পূর্ণতা, নিবৃত্তি ঘটান সকল ক্ষুধার
সর্বশক্তিমান স্বামী, সকল আধ্যাত্মিকতার দৈব কারিগর
দৃষ্টি দাও অন্তরে, আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।


উপনিষদের কল্পতরুর এক অক্ষয় ফল
প্রকৃত, দেহহীন যোগী,প্রাচীন সদগুরু
আলোকচ্ছটা, অপরিমেয় বাকস্ফূর্তি, সুন্দর, সৌম্যকান্তি
চিরকালীন, চিরন্তন, অতুলনীয়ভাবে উজ্জ্বল
দৃষ্টি দাও অন্তরে, আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।


অন্তরে চেয়ে,বিশুদ্ধ চোখে মেয়েটি নিজেকে দেখে
বহু গুণে গুণী, বহু কাজে সিদ্ধহস্ত
তিনি হলেন রাজযোগী, দাতা, পিতা
সকল বাসনা পূর্ণকারী, তিনি তোমাকে পূর্ণ করে তোলেন
দৃষ্টি দাও অন্তরে,আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।


সকল লজ্জা পেরিয়ে,অন্যের উপস্থিতি অজ্ঞাত হয়ে
সচেতন থেকে শিবের কর্মকাণ্ডে: সৃষ্টিস্থিতিলয়
অলক্ষ্যে থেকে, সকল পুঁথি ও জ্ঞান পেরিয়ে, পরমানন্দিত
অটল বিশ্বাস রেখে আদি প্রভুর প্রতি, যার প্রকৃতি চ্যুতিহীন, সময়হীন ও স্থির
দৃষ্টি দাও অন্তরে, আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।


জপমালা নয়,নয় বন্দনাগান অথবা গোত্রের জন্য বাসনা
মেয়েটির প্রয়োজন নেই পরিবার বা ধর্মাচার সেই পরমানন্দ স্তরে
ষটচক্রে অবস্থিত থেকে, এর কেন্দ্রে বিরাজ করে
সর্বজয়ী তাপসী, মুছে যায় ‘ধ্বনি’ ও ‘নাদবিন্দু’র দ্বিত্ব
দৃষ্টি দাও অন্তরে, আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।


জন্মচক্র হতে মুক্ত, দাহ করে সকল ধর্মাচার
ভস্মীভূত ছাইয়ের মত চির শান্ত,অবয়বহীন তাঁর প্রকৃতি
চির আনন্দিত, সমাধিতে দেহহীন
সচেতন, সময়শূন্যতা ও আকারশূন্যতার সকল বিভ্রম হতে মুক্ত
দৃষ্টি দাও অন্তরে,আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।


অহম্,আসক্তি চূর্ণ হয়, সৃষ্টি নয় বা ধ্বংস নয়
তার ক্ষেত্রে যে নয় পদ্মপাতায় জল—
বা নয় মধ্যগগনে ভাসমান এক বৃক্ষ
মেয়েটি যদি না সাহস করে, কেমন করে বর্ণিত হবে অবর্ণনীয় ফল?
সময়ান্তরে সে হয় পাথর, জল, আগুন ও ছাই
জগৎখানি ধরা আছে তার মহাজাগতিক চেতনায়,সবিস্ময়ে ভরা—
দৃষ্টি দাও অন্তরে,আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।

১০
অমৃতের নদী বেদ, তৃষ্ণা মেটায়
প্রবাহিত ধারাগুলি জড়ো করে পূর্ণ চাঁদের রশ্মি
পূর্ণ জ্ঞানী জানে না কোনো ভেদ, এক ও অন্যের মধ্যে
গায়ক, যিনি সিদ্ধ সপ্তসুরে
সমগ্র জগতের যিনি গুরু, উপযুক্ত অনন্ত পূজার—
দৃষ্টি দাও অন্তরে, আবিষ্কার করো নির্বাণ রহস্য, উপনীত হও সর্বোচ্চ স্তরে।

Bhashanagar