Bhashanagar

সোনালি মুখোপাধ্যায় ভট্টাচার্য

চিকিৎসক। তাঁর লেখা একাধিক বই রয়েছে। বসবাস কলকাতায়। ভাষানগর পুরস্কারে সম্মানিত।

ঘাট

চটপট গঙ্গামাটি দিয়ে মসৃণ একখানা বেদী বানিয়ে ফেলে হারু। তার মধ্যে আঙুল দিয়ে জল আর পিন্ড দেবার ফুটো সারি সারি।
ছল ছল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মীনা ভাবে কি আর্টিস্টিক কাজ, আর কি তাড়াতাড়ি করে চলেছে। সকাল থেকে কত মানুষের পিন্ডদান হল, আবার জায়গা পরিষ্কারের পর অন্য লোক এসে বসল কাজে।
সামনে একদল লোকজন এসে দাঁড়িয়েছে গংগার ঢেউকে ঢেকে।

চারজন পুরুষ কাছা পরে। মানে এরাই পুত্র। তাছাড়া বাঙালিদের মধ্যে আর কেউ ত এভাবে অশৌচ রক্ষা করে না। বিহারি পরিবারে অনেক সময় দেখেছে দূরের আত্মীয় পুরুষদেরও নেড়া হতে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে তো সে চল নেই। এখন অবশ্য বাঙালি বাড়িতে ছেলেও মাথা নেড়া করে না অনেক সময়েই। আধুনিক যারা, কাছাও পরে না আর।
মীনা একটু অন্যমনস্ক হয়ে ভাবে, সত্যিই তো, এইসব আগেকার দিনের রীতিনীতির কি আজকের দিনে কোন মানে আছে? কি যায় আসে কেউ মাথা নেড়া করায় বা না করায়? বা এই কোমরে কম্বলের আসন একটা রুমালের মত গুঁজে রেখে ? শোক কি আর এভাবে প্রকাশ করা যায় ? নাকি শ্রদ্ধা জানাতে গেলে অস্বস্তিতে ভোগাটাই জরুরি?

দৃষ্টি ফিরে আসে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চার মধ্যবয়সী মানুষের কাছে।
একজন অনেকটা লম্বা। ফর্সা বেশ। বাকি দু জন মাঝারি হাইট, বয়েস মনে হয় চল্লিশের কোঠায়। একজন বেশ কালো, ছোটখাটো চেহারা।
খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চিরুনী না দেয়া উস্কোখুস্কো চুল, সাদা সাধারণ ধুতি চাদর পেঁচানো গায়ে, লম্বা ভদ্রলোক বাদে সবাইকে চাষাভুষো মনে হচ্ছে। লম্বা লোকটির সাদা পিঠে চওড়া পৈতে, বাংগালী মনকে প্রথম অভ্যাসেই মনে করায় উচ্চবর্ণ। ছোটখাটো চেহারার মানুষটি থান ইঁটের মত একখানা ফোন কানের কাছে এনে এবার দ্রুত ইংরেজিতে কথা বলতে লাগলেন। মনে হচ্ছিল কাউকে নির্দেশ দিচ্ছেন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে।
মীনা চোখ নামিয়ে মনে মনে হেসেই ফেলে এবার।
ঘাটে আসলে সব সমান। হয়তো এই জন্যেই এমন অশৌচের রীতি তৈরী হয়েছিল ?
পিতৃ মাতৃ বিয়োগের দিনে, বিষয়ী অহমিকা, অর্থের দম্ভ, প্রতিপত্তির আড়ম্বর খুলে রেখে এই কটা দিন অন্তত সবাই নিঃস্ব মানুষের সমান। আগে তো মাটিতে কম্বল পেতে শুতেন সবাই, বাবা মায়ের কাছে শুনেছিল মীনা ছোটবেলায়।
জীবন মৃত্যু সমাজ সব তালগোল পাকায় মীনার মাথার মধ্যে।
এই ঘাট, এই অবিশ্রান্ত ঢেউ, এই বয়ে চলা গঙ্গা, যেন শ্মশানের এক্সটেনশন। এখানে শুধু চোখের জল আর বুকের মধ্যেকার হাহাকার নিয়ে আসছে দলে দলে মানুষ। না না, অনেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেও আসছে।
সকালে চাতালের ডানদিকের কোনায় যারা এসেছিল? চকচকে জামাকাপড় নিয়ে নিজেদের মধ্যে ইয়ার্কি করতে থাকা অল্প বয়েসী ছেলেমেয়ে বউয়েরা। সঙ্গের বয়স্ক মানুষরাও কেউ মুখ কালো করে ছিলেন না। পুরনো কষ্ট মুছে ফেলে বেশ নতুন চ্যাপ্টার শুরুর আমেজ ছিল সবার চোখেমুখে।
মীনা ভাবে পুরো ইনিংস খেলে আউট হলে কারোরই দুঃখ থাকে না।
আর বেশি থেকে গেলে মনে হয়, আরে যায় না কেন।
কিন্তু।

হারু সকাল থেকে একের পর এক পিন্ড দানের বেদী তৈরি করছে, আবার কাজ হয়ে গেলে, অভ্যস্ত হাতে কাপড় ভাঁজ করার মতো পুরো মাটি সব সমেত গুটিয়ে নিয়ে জলে ফেলে দিয়ে আসছে। এসে জায়গা মুছে ঝকঝকে করে দিচ্ছে নিমেষে যাতে আরেক পরিবার তাদের পুরোহিতকে নিয়ে বসে পড়তে পারে।
সারাদিন এই গঙ্গার মাটি আর জল ঘেঁটে হাত পা হেজে থাকে হারুর। কিন্তু এ কাজটাই ত বংশপরম্পরায় জানে ও। অন্য কাজ আর কিছু শেখেনি।

হারু মনে ভাবে, “চেয়রা দেখে মান্যি ঠিক হলে আমি হতেম বাবু। আর অই মস্ত ফোন কানে বেঁটে বাবুটা হত চাকর কি চাষা। কিন্তু ওরই পয়সা সব্বার বেশি। একখান বিশাল গাড়ি থেকে ডেরাইভার দৌড়ে এসে সুন্দর গিন্নির হাতে মস্ত প্যাকেট দিয়ে গেল। সব বাকি ভেয়েরা খুব খাতির করে কথা কইছে। বিস্তর পড়ালেখা করেছে নির্ঘাত।

বাপ ভর্তি করেছিল করপোরেশনের ইস্কুলে। ভাল লাগে নাই হারুর। চেহারাখানা খাসা ছিল। মেয়েরা হিরিক মারত কত। পটাপট বিয়ে করে এনেছিল মনাকে। বছর ঘুরতেই তিন খানা বাচ্চা। শেষে হারুর মা জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অপারেশন করিয়ে দিল মনার।
তিন আর দুয়ে পাঁচটা পেট তো আর হাওয়া খেয়ে ভর্তি হয় না।

ভিজে মাটির তাল নিয়ে ফের সিঁড়ি বেয়ে গঙ্গার ভিতরে নামে হারু। ভাঁটা লেগেছে। জল নেমে গেছে নীচে। পারে কত লোকের ফেলে যাওয়া পিন্ড, প্রেতকে দেওয়া জামা কাপড় আয়না সিঁদুর কৌটা। মেয়েদের স্নানের ঘরের ডোম বউটা এসে কাদা ঘাঁটে। যদি পছন্দের কিছু পাওয়া যায়।

মীনার মা এসে পিঠে হাত রাখতেই, মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল মীনা।
সোনুটা কিছুই দেখল না মা, কোথায় ও বড়দের কাজ করবে, তা না আজ ওর কাজ করতে এসেছি? কি লাভ হল তবে ছেলের মা হয়ে? শুধুই কষ্ট, শুধুই ক্ষতি —

হারু তোয়ালে দিয়ে নিপুণ হাতে জায়গা মুছতে মুছতে ভাবে, ” লাভ হল তো।
এই যে বাচ্ছার প্যান জামাগুলি গঙ্গার পারে রেখে যাচ্ছ, আমার ছেলেটা পড়ে খুশি হবে কত। আবার দামি চকোলেটের চকচকা বাক্স! চাইলে দিতে কেউ কখনও আমার বাচ্ছাকে? কেন? তোমাদের ছেলেপিলেরা ফেলে ছড়িয়ে খেতে পারে, আর আমাদের গুলো মানুষের বাচ্ছা না?
এখুনি পয়সা চাইব যেই, দরদাম করে একশ দুশ টাকার জন্যে তো গলা ফাটাবে–
দাও দাও, ছেলের নামেই দাও।
তোমার ছেলেটা মরে গিয়েও কারো কাজে তো লাগল।”

Bhashanagar