রাতে সব রক্তই কালো: যন্ত্রণার এক শাশ্বত মৌচাক

3046
7454
David Diop

দীপায়ন দত্ত রায়

“বন্ধু, যদি কাল রাতের রক্ত তোমার হাতে লেগে থাকে/রাতের শিশিরে মুছে ফেল/এখনও ইতিউতি অনেক খুন করা বাকি।” [অনুবাদ নিবন্ধকারের]।

উপরের এই পঙক্তিগুলি লিখেছিলেন সেনেগালের মহত্তম কবি (এবং স্বাধীন সেনেগালের প্রথম রাষ্ট্রপতি) লিওপোল্ড সেঁগর, যাঁকে আজও পৃথিবী মনে রেখেছে তাঁর ‘ফ্রান্সে মৃত সেনেগালীয় বন্দুকধারীদের প্রতি’ কবিতাটির জন্য। ১৯১৭-এ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন থামে তখন সেঁগর-এর বয়স এগারো। কিন্তু ওইবয়সেই যুদ্ধ সম্পর্কে যে ভয়াবহ ধারণা তাঁর হয়েছিল, তা কখনও ভোলেননি সেঁগর। ভোলেনি সেনেগালের মানুষ।

এরপর কেটে গেছে একশ বছর। ২০১৭ সাল। ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড দিয়োপ (ইনি সেনেগালের বিখ্যাত কবি ডেভিড দিয়োপ নন, যাঁর ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি শঙ্খ ঘোষের অনুবাদে ‘বহুল দেবতা বহু স্বর’-এ সংকলিত) লিখবেন Frère d’âme। পরের বছর প্যারিসে প্রকাশিত হবে সেই উপন্যাস। আরও দু’বছর পর ২০২০-তে আনা মস্কোভাকিস-এর ইংরেজি অনুবাদে উপন্যাসটি প্রকাশ পাবে ‘At Night All Blood Is Black’ শিরোনামে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলি ইচ্ছামতো তাদের উপনিবেশ থেকে কিশোর, তরুণদের ডেকে নিত, যাদের বলা হতো tirailleurs— একধরণের পদাতিক সৈন্য যাদের মূলত ব্যবহার করা হতো ইউরোপীয় সেনাদের প্রাথমিক বর্মের মতো করে। যেমন এক্ষেত্রে ফ্রান্স, তাদের স্বদেশীয় সেনাদের শত্রুপক্ষের মুখে ঠেলে দেওয়ার আগে যুদ্ধে নামাত এই সেনেগালীয় বন্দুকধারীদের। স্বাভাবিকভাবেই এদের মৃত্যুর হার ফরাসী ভূমিপুত্রদের তুলনায় ছিল অনেক বেশি।

এমনই এক tirailleur-এর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ‘At Night All Blood Is Black’। অনতিদীর্ঘ এই উপন্যাস শুরু হয় আলফা এনদিআয়ে-র স্বীকারোক্তি দিয়ে। প্রথমেই একেবারে স্পষ্ট না-হলেও আলফার কথা শুনে অন্তত এটুকু বুঝতে পারি “প্রগাঢ় অন্যায় কোনো ঘটে গেছে” (শঙ্খ ঘোষ)। কিন্তু কি সেই ‘অন্যায়’? কিছু পৃষ্ঠা এগোতেই বুঝতে পারি, আলফার সঙ্গেই যুদ্ধে যোগদান করা তার অভিন্নহৃদয় বন্ধু মাদেম্বা দিয়োপ-কে মরতে হয়েছে জর্মনদের গুলিতে। এই মাদেম্বা-ই মূল ফরাসি সংস্করণটির শিরোনামের “frère d’âme” বা “soul brother”।

ভয়ংকর সেই রাত আলফার স্মৃতিতে অমলিন। মাদেম্বা মাটিতে পড়ে আছে “with his guts spilling out like a sheep that has been dismembered after the sacrifice.” প্রিয়তম বন্ধুর নৃশংস মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখছে আলফা। সে-সময় মাদেম্বার ক্ষত-বিক্ষত অবস্থা দেখে আলফার মনে হচ্ছিল যত তাড়াতাড়ি ওর মৃত্যু আসে ততই ভালো। কিন্তু মাদেম্বা মরতে অনেকটা সময় নিচ্ছিল আর ক্রমশ দীর্ঘায়িত হচ্ছিল ওর যন্ত্রণা। আলফার মনে হচ্ছিল, তার বন্ধুটি যেন মৃত্যুকে প্রসব করতে চলেছে। অবশেষে মারা যায় মাদেম্বা। আলফা তাঁবুতে ফেরে দুটো লাশ নিয়ে : একটি বন্ধুর, আরেকটি তার নিজের মনুষ্যত্বের। সে রাতে মাদেম্বার সাথেই নিহত হয়েছিল মানবতা (ওলোফ্ ভাষায় ‘মাদেম্বা’ নামশব্দটির একাধিক অর্থের একটি হল ‘মানবতা’)।

প্রতিশোধস্পৃহ বীতনিদ্র আলফা প্রতিরাতে ধারালো অস্ত্র (machete) সঙ্গে নিয়ে যেতে শুরু করে ‘শত্রু’ জর্মনদের তাঁবুতে। তারপর একজন করে ঘুমন্ত জর্মন সেনাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় তাঁবু থেকে নির্জন দূরত্বে, অপেক্ষা করে তার ঘুম ভাঙার। তারপর জেগে উঠলেই কোপানো শুরু। খুন করার সময় সেই জর্মনের নীল চোখে চোখ রেখে আলফা দেখে তাদের ভয়, আতঙ্ক, বাঁচার শেষ আর্তি। তারপর আরও কয়েক কোপে সব শেষ। প্রতিরাতে আলফা নিজের তাঁবুতে ফিরে আসে কোনো না কোনো জর্মনের কাটা হাত নিয়ে। বলে, সেই হাত তার জয়ের স্মারক। আর বলে, রক্ত শ্বেতাঙ্গরই হোক বা কৃষ্ণাঙ্গের, রাতে সব রক্তই কালো।

নিরীহ, মানবিক আলফা ক্রমশ হয়ে ওঠে নৃশংস, পাশবিক। বদলে যায় তার ভাষার ব্যবহার, জেগে ওঠে তার ভিতরে প্রোথিত মর্ষকাম, যা এতদিন ছিল তার নিজেরই অজানা। বদলে যায় লেখকের চিত্রকল্প। বিতন্ত্রিত আলফার অবচেতন অন্তঃসূত হয় দিয়োপের আগ্নেয় গদ্যে। যুদ্ধের ট্রেঞ্চকে দেখে আলফার মনে হয় যেন “the slightly parted lips of an immense woman’s sex. A woman, open, offering herself to war, to the bombshells, and to us, the soldiers.”

আলফাকে ঘিরে ছড়াতে থাকে নানারকম গুজব। গুজবকে আলফার মনে হয় সে যেন কোনো “shameless woman in the air with her legs spread, her ass in the air.” আলফার বদলে যাওয়া ভাষায় তখন শুধুই ধর্ষকাম। গুজব যেন আলফাকে ধাওয়া করছে “like a little slut”।

এর কিছু পরেই শুনব সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে আলফার নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তি: সে নৃশংসভাবে একটি মেয়েকে ধর্ষণ ও খুন করেছে। অথচ এই আলফা-ই যুদ্ধে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ছিল প্রাণময়, হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল, প্রেমাসক্ত, উচ্ছল এক বছর কুড়ির তরুণ, যাকে দেখে বলতে ইচ্ছে করবে “জরা নেই পৃথিবীর, শতকে শতকে পুনর্ণবা” (‘স্ফুলিঙ্গ’, হুয়ান রামোন হিমেনেথ/শঙ্খ ঘোষ)।

কিন্তু দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে এই তরুণের
জীবন। শুধু ‘ভাইয়ের অধিক বন্ধু’-র মৃত্যুই নয়, ‘প্রভু’ ফ্রান্সের আদেশ পালন করতে গিয়েও অনন্যোপায় আলফার মতো নিরীহ সেনেগালীয়রা হয়ে ওঠে ‘বর্বর’, ‘দানবিক’। বলা ভাল, তাদের ‘বর্বর’ বানানো হয় তিলে-তিলে।

আলফা এনদিআয়ে নিজেও জানে: “France needs for us to play the savage when it suits them. They need for us to be savage because it suits them. They need for us to be savage because the enemy is afraid of our machetes.” ইতিহাস সাক্ষী, যখন ফ্রান্সের হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়া সেনেগালীয়রা জর্মনি আক্রমণ করে, তখন সেই ঘটনাকে ফরাসি আর জর্মনরা সমবেতভাবে নাম দেয় ‘Die Schwanze Schande’ (রাইনের তীরে কালো আতঙ্ক)। কিভাবে সাদা চামড়ার দুটো দেশের বৈরিতাকে ছাপিয়ে তাদেরকে এক বিন্দুতে এনে মিলিয়ে দেয় বর্ণবিদ্বেষ, তার ইঙ্গিত আছে দিয়োপের এই উপন্যাসে।

প্রায়োন্মাদ আলফা বুঝতে পারে, জীবনের থেকে বহুদূর চলে এসেছে সে, যেখান থেকে মূলস্রোতে ফেরা অসম্ভব। এই উপলব্ধি ক্রমশ নীরব করে দেয় তাকে। সাময়িকভাবে মনে হয়, নির্লিপ্তিই তাহলে আলফার শেষ বর্ম। কিন্তু না, নীরবতাও তাকে শান্তির আলো দিতে পারে না। ঘিরে ধরে অন্ধকার এক নিঃশব্দ বলয়। অথচ এই কিছু দশক আগেও তো আমরা জানতাম, নৈঃশব্দ্য শান্তি এনে দিতে পারে।

আমাদের শঙ্খ ঘোষ-ও তো বলেছিলেন— “আমাদের… যাপনের চারপাশে ঘিরে আছে একটা নিঃশব্দ বলয়। সকলে হয়তো তাকে দেখতে পান না, দেখতে চান না, কিন্তু যিনি যাপন করতে করতে জীবনকে লক্ষও করতে থাকেন, তিনি জানেন শব্দহীন এই অদৃশ্য বলয়ের টান। সে নীরবতার কোনও নাম নেই, কিন্তু আর্তনাদ আছে। সে-নীরবতা… জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয় না, আরো বেশি সংসক্ত করে দেয় জীবনের সঙ্গে।” (‘ইশারা অবিরত’)।

কিন্তু আলফার ক্ষেত্রে তা হয়না। তার নীরবতা তো আসলে স্তব্ধতা, থেমে যাওয়া। তাই শঙ্খ ঘোষ যতটুকু নিশ্চয়তার ছবি আমাদের দিতে পেরেছেন, আলফা সেটুকু নিশ্চিত-ও হতে পারছে না, কারণ সে জানে দোদুল্যমানতাই একমাত্র স্থিরতা, অনিশ্চয়তাই একমাত্র নিশ্চিত। সে বলে, “each thing is a double”, এই যেমন তার মা একইসঙ্গে তার সমস্ত সুখ, সমস্ত দুঃখের কারণ কিংবা সে নিজেই যেমন ” double” — “I empty skulls and bodies… I am assassin and judge… I am innocent and guilty. I am the beginning and the end. I am the creator and the destroyer. I am double.”

আলফা যে-ই বলল, “I am the beginning and the end”, অমনি আমাদের মনে পড়ে গেল বাইবেলের ‘দ্য বুক রেভেলেশন’-এর কথা, যেখানে ঈশ্বর বলছেন, “I am the Alpha and the Omega, the First and the Last, the Beginning and the End.” তবে কি আলফা নিজেই ঈশ্বর, সে-ই আবার দানব? ঔপন্যাসিক দিয়োপ কোনো প্রত্যক্ষ উত্তর দেননি। বোধহয়, আমাদের সবার মধ্যে মহৎ আর অশুভ শক্তির দ্বৈত সত্তার সমান্তরাল সহাবস্থানকেই বুঝিয়েছেন দিয়োপ।

আলফা এনদিআয়ে-র গল্প শুধু আলফার একার নয়। একটা গোটা দেশ, জাতি কিভাবে যুগের পর যুগ নির্বিকারে ব্যবহৃত হয়েছে, তারই আখ্যান ‘At Night All Blood Is Black’। মানুষের কাছে এই গল্প পৌঁছে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ ডেভিড দিয়োপ-কে। দিয়োপ-এর বাবাও ছিলেন সেনেগালের মানুষ। লেখক নিজেও জন্মেছেন সেনেগালের রাজধানী শহর ডাকার-এ। আঠারো বছর বয়সে ফ্রান্সে পাকাপাকিভাবে চলে আসার আগে পর্যন্ত পিতৃভূমি সেনেগাল-ই ছিল তাঁর আশ্রয়।

তবে শুধু দিয়োপ-কে কৃতিত্ব দেওয়াটাই যথেষ্ট হবে না। কৃতী অনুবাদক আনা মস্কোভাকিস (নিজেও একজন ঔপন্যাসিক। তাঁর লেখা ‘এলিনর’ উপন্যাসটি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে সমাদৃত) এমন সাবলীল ঝরঝরে ইংরেজি অনুবাদ না করলে, বৃহত্তর পাঠকবর্গ বঞ্চিত হতেন। দিয়োপ-এর লেখার ক্ষিপ্র স্বাদুতার নির্যাস অক্ষুণ্ণ রেখে স্বাধীনভাবে অনুবাদ করেছেন আনা। যেমন, সেনেগালে অতিপ্রচলিত ‘টৌবাব’ শব্দটিকে ইংরেজি অনুবাদে অপরিবর্তিত রেখেছেন তিনি (‘টৌবাব’ একটি ওলোফ্ শব্দ; শেতাঙ্গ ইউরোপীয়দের সেনেগালে ওই নামে ডাকা হয়)।

উপন্যাসের মধ্যেও এসেছে অনুবাদের প্রসঙ্গ, তবে অন্য অনুষঙ্গে। আলফা ফরাসি জানেনা, তাই ঊর্ধ্বতন সেনার সব নির্দেশ তাকে তার বোধগম্য ভাষায় বুঝিয়ে দেন একজন দোভাষী (interpreter)। কিন্তু প্রতিবারই আলফা লক্ষ করে, সেনাপ্রধান নির্দেশ দিতে যত সময় নেন তার চেয়ে অনেক কম সময়ে দোভাষী সেই নির্দেশ তার ভাষায় ‘অনুবাদ’ করে দেন। তবে কি সবটা ‘অনুবাদ’ করছেন না ওই দোভাষী? কিছু কথা কি বাদ দিচ্ছেন? আর এখানেই দিয়োপ লিখছেন — “To translate is never simple. To translate is to betray the borders, it’s to cheat, it’s to trade one sentence for another.” পরের মুহূর্তেই লেখক অবশ্য এটাও বলছেন, “To translate is one of the only human enterprises in which you are required to lie about details to convey the truth at large.”

দিয়োপ নিজেও তো তা-ই করেছেন। যদিও ‘At Night All Blood Is Black’ ফিকশন, তবু একশ বছর আগের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতাকে আবহমান যন্ত্রণার আখ্যানে অনুবাদ করেছেন তিনি। আর এভাবেই দিয়োপের উপন্যাস ক্রমশ হয়ে উঠেছে মহাপৃথিবীর সনাতন এক মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের নায়ক আলফার মতো আমরাও প্রতিনিয়ত লড়ে চলেছি আমাদের নিজেদের ভেতরকার দানবের সঙ্গে। লড়াইয়ে জিতব কি না জানি না। তবে জিতলে দেখা পাব আমাদের অন্তস্থিত ঈশ্বরের, কখনও যে “ঈশ্বরের সঙ্গে [আমরা] বিবাদ করিনি” (‘ঈশ্বর! ঈশ্বর!’/ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)।

3046 COMMENTS

  1. Heya! I just wanted to ask if you ever have any issues with hackers? My last blog (wordpress) was hacked and I ended up losing several weeks of hard work due to no backup. Do you have any methods to prevent hackers?|

  2. It is perfect time to make some plans for the future and it is time to be happy. I’ve read this post and if I could I wish to suggest you few interesting things or tips. Maybe you can write next articles referring to this article. I want to read even more things about it!|

  3. Please let me know if you’re looking for a article writer for your
    weblog. You have some really good posts and I think I would be a good asset.
    If you ever want to take some of the load off, I’d really like to write some material for
    your blog in exchange for a link back to mine.
    Please send me an e-mail if interested. Regards!

  4. Hi, I do believe this is a great blog. I stumbledupon it 😉 I am going to come back once again since I bookmarked it. Money and freedom is the best way to change, may you be rich and continue to guide other people.|