ফ্রিডরিশ শিল্যারের কবিতা

0
118

অহ নওরোজ ভাষান্তরিত

আধুনিক জার্মান সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব যার হাতে সংজ্ঞা পেয়েছে তিনিই শিল্যার—পুরো নাম ইয়োহান ক্রিস্টোফ ফ্রিডরিশ (ফন) শিল্যার—তৎকালীন হাইলিগেস র‍্যোমিশেজ (পবিত্র রোমান) সম্রাজ্যের অন্তর্গত ভুর্টেমব্যার্গের মারবাখ শহরে ১৭৫৯ সালের ১০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। জার্মান সাহিত্যে মহাকবি গ্যোয়েটের পর তার নাম সবথেকে উচ্চারিত। নাটক দিয়ে লেখালেখি শুরু হলেও পরে কবিতা এবং নন্দনতত্ত্ব নিয়ে লিখেছেন। ১৮০৫ সালের ৯ মে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে পরলোকগত হন।
ফ্রিডরিশ শিল্যারের কবিতা পড়তে শুরু করি জার্মান এবং ইংরেজির সহায়তায়। এরপর কবির জন্মস্থান মারবাখ শহরে ঘুরে আসার পর, সেই পাহাড়ি উঁচুনিচু পথ, নেকা নদী তার কবিতাগুলোকে আরেকভাবে বুঝতে সাহায্য করে। আধুনিক জার্মান সাহিত্যের শুরুটা বুঝতে গ্যোটে আর শিল্যারের রচনা পাঠের বিকল্প নেই। ফ্রিডরিশ শিল্যার নানা রকমের সনেট, ব্যালাড থেকে শুরু করে নানা রকমের কবিতা লিখেছেন। তার কবিতার মধ্যে দার্শনিক আখ্যান এবং উপদেশমূলক বাক্য বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায়, সেকারণে অনুবাদের পরও কবিতার শরীরে তাদেরকে ধরে রাখা বেশ কঠিন। আর কবিতা পড়ার যে আনন্দ—অনুবাদের মাধ্যমে সেই আনন্দ অন্যকে পাইয়ে মূলত দুঃসাধ্যের মতো, কেননা একেক ভাষার অভিগমন বা অ্যাপ্রোচ একেকরকম, সেটাকে অনুবাদের পরও অনেকাংশে ঠিক রাখা যায় না। তবু সবমিলিয়ে অন্য ভাষার কবিতা পড়ার ক্ষেত্রে অনুবাদের কাছেই দারস্ত হতে হয়। নিচে অনূদিত কবিতাগুলো ১৮০০ সালের আগের সময়ে লেখা।

যে চায় রোদ এনে দিতে

লোকদের ভালোবেসে সবকিছু ছেড়ে রেখে গেছো—
তবু দ্যখো সব খসে গেছে—ঘৃণা আর ব্যথা প্রতিদান হলো।

কীভাবে তাদের কাছে গেছি, নরম হাতে সামলেছি
তবে সবকিছু বলি খুলে শোনো—

‘খোদা আমাকে ঠকায়নি কখনো।
একথা ভেবে অথবা
লোকদের উপকারে ঢের পরিমাণে মিহি রোদ এনে
বাতাসে যেওনা হিম হয়ে’
বিশ্বাস করো এই কথাগুলো—
কিংবা মনে রেখে রেখে উড়ে চলা ভালো।
আর যারা ভালোবেসে কাছে আসে,
তার কাছে গোল হয়ে বসো, কুসুমিত হাসি রাখো।

কেবল শিশির কিংবা বৃষ্টি,
মানুষের উপকারে আসে
বেহেশতের সুবাস তাদের দেহেই আছে।

নীল কোনো বাসনা

এইসব চরাচরে, নীল ঘন অন্ধকারে
বারবার নিহত হয়ে যাই।
রোয়া ওঠা হিম
তবু মৃদু বয়ে যায়—

বহুদূরে দৃশ্যরা কাঁপে
যেন আমাকে পাখি হতে বলে—
মনোরম পাহাড়েরা পিছলে যায়
পরিযায়ী চোখে—
তারা যেন চিরকাল থির হয়ে আছে।

ওখানে সবকিছু সুরেলা, যেন বাজছে বাঁশরি
মিহি আলোগুলো আকাশের দেহে ভেঙে আছে
সুরভিত বাতাসেরা গড়িয়ে যাচ্ছে অতি ধীরে—
ওখানে গাছে গাছে স্নেহ যেন—যেন সোনা
যেন তার মাঝখানে উঁকি দেয় ঝিলিমিলি পাতা
যেন এক ডালিয়ার দেশ—
সবকিছু ফাঁকি দিয়ে ঢের বেঁচে আছে।

ভালো হতো ভেসে গেলে
অনাহত ওই রোদের ভেতর
অথবা বাতাসে আরো দূরে উড়ে গেলে
নিঝুম হতো বুকের ভেতর।
হয়তো নিজেকে ফালি করে কেটে
ধূসর হতাম নিজের ভেতর।

এখন চারপাশে জলের শব্দ হয়
দুলছি যেন নৌকার অভ্যাসে
মাল্লারা বহু আগে নিখোঁজ হয়ে গেছে
বাতাসে কেবল বেঁচে আছে পালগুলো।

রেখে যেও আস্থা, অথবা সাহস—
অলৌকিক পশমের পাশে
বেমালুম জল হয়ে পড়ে থাকে মাছেরা,
অথচ করোটির ভেতর সমুদ্রেরা
শাঁসালো জোয়ারে দিনরাত কাঁপে।

রমনীর হাত

নারীর হাতেই সব, কেননা সে এক ধীর অবয়ব
যেন কেবল নিঝুম—প্রগলভ লোকের থেকে আলাদা।
পুরুষ লোকের চারপাশে নিয়মেরা সুর হয়ে বাজে
সব লাবণ্য তবু রমণী-হাতেই ফোটে—
বহু লোক কাজ আর হাসি দিয়ে সবকিছু অধিকার করে
তবু শরতেরা নুয়ে থাকে জোছনার গায়ে

সব পাতা একদিন খসে যায়, ফুলদের হাসি তবু
সবখানে ঢেউ তোলে সরোবরে—

জীবন-পথের আলো

করোটির মাঝখানে রয়েছে বোধেরা—আমাদের পথে পথে আলো রাখে তারা —
দু’হাত বাড়িয়ে দিলে, অগনিত সন্ধ্যা নামে দেহের ভেতর—
তারা রোদ আনে কথার ভেতর— আর বাতাসের মতো পিছলে যায় আয়ুরা—
জীবনের সব লেনদের কিংবা নিয়তিরা তাদের শরীরে যেন ভারহীন
কখনো তবু কোনো বিকেলে, নিয়ে যায় অতল দীঘির কাছে
বলকানো অনন্তে জরা কাঁপে যেখানে,
অথবা যেখানে কেউ নেই হাসি রাখে ভালোবেসে—

রোদ রোদ ডোরাকাটা দিন ভেবে নির্ভুল বিশ্বাসে
নিজের হাতের কথা ভুলে
বিজন বাতাসে একা ভেসে যেতে নেই
ভুলে যেতে নেই নিজের গলার স্বর—

সমর

আর কোনো যুদ্ধ নয়
আর কোনো সীমানার শেষ ভেঙে ফেলা নয়।
যদি পারো আমাকে শীতল করো—
নিজেকেই বারবার বলি—
কী হবে এতো ভালো হয়ে?
যদি পারো নিভিয়ে ফ্যালো
বুকের ভেতর জ্বলে আছে শিখা যত।
আর আলোর আঘাতে যদি ভেঙে পড়ো
দাবী রেখে যাও বিসর্জনের।

কসম খেয়েছি পুনর্বার—
যেন আরও বিনীত থাকি।

বিবেক তুমি সকালের বকুল—
এতোদিন শুধু জিতে আছো—
আজ তবু চিরতরে ভুলে যেতে দাও
যাকে বলো নীতি কিংবা ভালো—
অথবা চাও যদি
অপরাধে আহত হতে দাও আমাকে ।

ছিঁড়ে ফ্যালো আগেকার যাতায়াত,
অথবা যেসব অঙ্গীকার ছিলো।
বিবেকের মুকুটে ফুলেরা মরে গেলে
হয়তো আরও ভালো হতো—
নেশার আড়ালে সুখী হওয়া লোকের মতো
প্রেমে পড়ে সহজে নিহত হওয়া যেত।

ও তো আমাকেই ভালোবাসে—
দেখে রাখে সবকিছু—
আমার সবুজ জীবনের ফুলগুলো
কুরে কুরে খেয়েছে নরম পোকারা
সূর্যাস্তের মতো দেহ থেকে সরে গেছে বসন্তেরা—
অথচ সে মিহি কণ্ঠস্বরে গড়িয়ে থেকেছে চারপাশে
যেন তারিফ করে গেছে অনায়াসে।

অনাস্থা অথবা ভালো বলি যাকে
তোমাদের ঐশ্বরিক উদারতা
কিংবা সকল সহানুভূতি,
এতদিনে খুনি করেছে আমাকে।
এই বিশাল জীবনে এর থেকে ভালো
কী হতে পারে?

অপরাধ থেকে চিরকাল পালাতে চেয়েছি
অথচ ভাগ্য শুধু এগিয়েছে গথিক রীতিতে
যেন আজ ভুলে গেছি আমাকেই।

[‘সমর’ কবিতাটি ফ্রিডরিশ শিল্যারের প্রথম প্রেমিকা শার্লোটে ফন কাল্বকে নিয়ে লেখা। শার্লোটে ফন কাল্বের সঙ্গে শিল্যারের যখন প্রেম হয় তখন শার্লোটে বিবাহিতা। তৎকালীন সমাজে পরকীয়াকে প্রচণ্ড অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। শার্লোটের প্রেমে পড়ার পর নিজের বিবেকের সঙ্গে শিল্যারের অর্ন্তদ্বন্দ্ব এই কবিতায় উঠে এসেছে। কবিতাটি ১৮০০ সালে প্রকাশিত হয়।]