Ein Stückchen Leben – বিন্দু জীবন

0
222

রীতা চট্টোপাধ্যায়

Heimweh nach dir (nostalgic for you)

বিশুদ্ধ বাতাবরণ, দিন জুড়ে তুষারপাত,
তীব্র রুপো রঙা দিন, যেন ব্রহ্মের আস্বাদ। কোনো আকার নেই, তল নেই,নেই কোনো পরিধিও, সূর্যোদয় নেই, নেই সূর্যাস্ত, সবকিছুকে ছাপিয়ে ওঠা গুটিকয়েক প্যান্সিফুলেরাও লুকিয়ে।
ঋণ থেকে যাবে শুধুমাত্র গাছেদের কাছে, কতো নাম না জানা গাছের কাছে, এ যেন সেই দুরন্ত জাদুকরের দিন বদলের ভানুমতীর খেলের মতোই  দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক বিমুগ্ধ পরাবাস্তবে।
সাদা ক্যানভাস অনেক সময় শতশত পাণ্ডুলিপির থেকেও মুখর হয়ে ওঠে।

ভোরের কফি বানাতে বানাতে রোজির  মনে পড়ে কোনো ছায়া নয়, ছায়াপথ নয় একটা সূর্যোদয় দেখতে গিয়েছিল সে প্রাগের চালস নদীর ওপর ব্রীজ থেকে। সঙ্গী বোরখা পরা আফ্রিকান মেয়েটি এদিক ওদিক সর্তকভাবে তাকিয়ে মাথার ঢাকাটা খুলে ফেলছিল, একঢাল কালোপশমের  মতোন  চুল ওর ঘাড়ে পিঠে যখন ছড়িয়ে ঠিক তখনই পূর্ব আকাশে সেই আলোর ম্যাজিক।
এসব কথা আরও কত মুহূর্ত-কথা হেনরিস কে বলা হলো না।

নির্বাসন, নির্বাসন।সমস্ত জাগতিক বন্ধন মুক্তির সময়ও এ মেয়ে ভোলে না হেনরিসকে।
ওইতো সেদিনের কথা যেন, এক নিঃশব্দ ট্রেন,নিঃশব্দ কিছু মানুষজন, শব্দ হীন ট্রেনের দরজা দুপাশে সরে যায়, নাকের ওপরে চশমাটা একটু উঠিয়ে দিয়ে রোজির কপালে বিদায় চুম্বন ক’রে অভিমানী পিতৃভক্ত হেনরিস সুটকেস টা নিয়ে উঠে পড়ে ফ্রান্স থেকে জার্মানিগামী এক চলমান শব্দহীনতায়,
You took the sun with you when you left.

একটা তীব্র শূন্যতা নিয়ে কেমন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে গাড়ীর চাবি টা হাতড়ে  বেড়ায়  নিজের  ব্যাগের ভেতর, ওটাই  একমাত্র এখন ওকে পৌঁছে  দেবে হেনরিস সান্নিধ্যে,হেনরিসের ব্যবহার করা যে পোষাকগুলো রয়ে গেল রোজির কাছে,  সেগুলোর গন্ধের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে হেনরিসকে। সুগন্ধ বিলাসি ওই পুরুষের সব গন্ধই যে বড্ডো আপন তার.. সে এক মিশ্র গন্ধ,  সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পারফিউমের সাথে তার নিজের পুরুষ, প্রথম পুরুষ বা কিছু অর্থে একমাত্র পুরুষের  গন্ধ।

হেনরিসের বাবাকে রোজির চিঠি

হেনরিসের বাবা,
আপনাকে বাবা বলতে ইচ্ছে হয়নি কোনোদিন আর এখন তো সে প্রশ্নই নেই।  যে অধিকারে আপনাকে বাবা বলা, সেটা আর নেই, দৃশ্যপটের বদল.. সম্পর্কের বদল..। কিন্তু জানেন, সারাটা জীবন আপনি এতো বেশি করেছিলেন ফেলে আসা ঘরদুয়ারে, ফেলে আসা মানুষটির মধ্যে..তবু…

সেই ঘোর লাগানো দিনগুলোতে। সেই প্রথম শীতের কমলা আলোয় এ মেলা সে মেলা,  কফির দোকান, রেস্তোরাঁ, দূরপাল্লার বাসে ট্রেনে, হাজারও লোকের মাঝে স্বর্গীয় নীল রং আলাদা করে দিতো, যেন ঢেকে  দিত আমাকে আর হেনরিসকে, ঠিক  তখনও আপনি প্রবল যন্ত্রণার কালো ছায়া হয়ে ঘিরে  থাকতেন,সদ্য কৈশোর  পেরোনো হেনরিসকে। অঙ্গীকারের ভঙ্গিতে  বলে যেত সে, “আর মাত্র ক’দিন রোজগার একটু বাড়লেই মাকে নিয়ে আসবো, বুঝুক লোকটা।”

২১-এর সন্তান আপনার। বৈবাহিক প্রথম সম্পর্কেই হেনরিস চলে এলো পৃথিবীতে,নারী পুরুষের নানান সমীকরণ, ১৭-র কিশোরীটিকে আবিষ্কারের আগেই আপনি শারীরিক ভাবে বাবা হয়ে গেলেন কিন্তু মানসিক ভাবে যেন প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে  শুরু করলেন ওই শিশুটিকে।

আর পিতৃস্নেহ বঞ্চিত শিশুটির শৈশবের  রঙ্গীন দিনের ফ্রেমে রয়ে গেলো সাদা-কালো তে কিছু ছবি। মাঝরাতে আপনার সুঠাম হাত ওকে পাঁজাকোলা করে মায়ের পাশ থেকে সরিয়ে নিচ্ছে অন্য একা কোনো ঘরে। যে ঘরের দেওয়ালে রাস্তার অল্প আলোগুলো তৈরি করছে নানান ভয়ের মুখ, ভয় পাচ্ছে ও, ভীষণ ভয়। কিছুতেই ঘুম ভাঙ্গতে পারবে না ওর,  আপনি মারবেন, খুব মারবেন।
আপনার  বন্ধুর বাগানের নতুন ফোটা  গোলাপটা ছেলেমানুষীতে ছিঁড়ে ফেলেছিল ও,কী ভীষণ শাস্তি!  আপনার হাতের  জ্বলন্ত সিগারেট চেপে  ধরলেন। এইসব কত ছবি সারা জীবন বহন  করেছে হেনরিস – বহন করেছি আমি,বহন করে আমার সন্তান।

রাত অফিস শেষে বরফপড়া ভোররাতে হেনরিস একা ড্রয়িং রুমে জান্তব শব্দ করে টেলিফোন করতো আপনাকে….
Do you love me papa? Love me or not? Please tell me. I can’t accept your death before mine papa, just tell me if you love me or not.  ভয় পেতো ওর বাচ্চাটা,আধো ঘুমে উঠে আসতো কাঁপতে কাঁপতে …বিধ্বস্ত  পিতৃস্নেহ কাঙাল বাবাকে,তার জান্তব চিৎকারকে ভয় পেত।

আপনাকে  ঘেন্না করেছিলাম প্রথম সেদিন।বিয়ের পর প্রথম রাত ,আপনার  বাড়িতে,তাও কয়েকদিনের জন্য। হেনরিস ওর বাড়ি আপনার থেকে আলাদা  ক রেছিল অনেক আগেই, আপনি মেনে নিতে পারেননি ওর যৌবনও, মনে আছে আপনার? আপনি একটা ছোট্ট ঘরে  আমায় একা ডেকে নিয়ে বলতে শুরু করলেন হেনরিসের ছোটবেলা থেকে  তখনও পর্যন্ত ওর যা যা অপছন্দ করেছেন  আপনি। বললেন যে ছেলেটির সাথে জীবন শুরু করলাম সে ঠিক নয়। এর সব দায়িত্ব  আমার, বাবা হিসাবে আপনার কোনোওই দায়িত্ব নেই, আর ব্যাঙ্ক এর বইটা  নিয়ে  আমায় দেখিয়ে বললেন,কত গরিব  আপনি। কিন্তু তখনও আপনার মোটা মাইনের সরকারি চাকরি আর অবসরে যেতেও অনেক দেরি।
কেন এসব ওই দিনে? কেন ওই বিশেষ দিনে?
২৩/২৪ সে আমি কিছু বুঝতে  পারিনি।আসলে গরীব ছিলেন বড্ড মনে, ব্যাঙ্কের বইতে নয়। সেটা বুঝেছি সারা জীবন ধরে।

অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা পেরিয়ে  … পিতৃস্নেহ পাগল…বাবা হয়েও বাবা না হতে পারা…  সারা জীবন ছটপট করা প্রৌঢ় হেনরিস আবার আবারও নিজের  সব সঞ্চয় পায়ে দলে সেই ২১ এর যুবকের পিতৃস্নেহ  চায়… love him… please love him…
রোজি হফম্যান।

একাকিত্ব

গ্রীষ্মের শেষে পাহাড়ের ঢালে প্রথম বৃষ্টিতে মাটির থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখে শীতলতার গন্ধ পায় রোজি। Orphanage এর বাচ্চাদের  শেষ না করা টুপি গুলোর কথা মনে পড়ে যায়।
উলবোনো তুমি একা রোজি, দক্ষিণ ফ্রান্সের  তোমার একা আরাম কেদারা একটু একটু করে দুলুক স্মৃতিতে পরতের পর পরত ছাড়িয়ে ঢুকে পরো শৈশব কৈশোর থেকে যৌবন হেনরিসে। রোজের  মতোই অস্ফুটে প্রার্থনার মতো একই ভাবে বলো, বলেই চলো
You are everywhere except right here and it hurts, it hurts me.

Redcross এর  সাহায্যের গাড়িটি দিনের খাবার  দরজার বাইরে রেখে বেল বাজিয়ে যাক । দ্রুত শেষ করো তোমার অসমাপ্ত কাজগুলো, শীতের আর বেশি দেরি নেই ।
রাতের খাবারের বেল বাজলে দরজা খুলো রোজি,না হলে ওরা দুপুরের অভুক্ত খাবার দেখে এমারজেন্সিতে  ফোন  করবে ।
Go on, open the door for the rest of life.

তোমাকে টুপি পরা বাচ্চাদের ছবি পাঠাবেন  Miss Muller একঝাঁক নতুনদের ছবি, বৃদ্ধঘোটকীর মতো দেখো রোজি। পৃথিবী নতুনই থাকে,শরীর শুধু বৃদ্ধ হয়।

যুদ্ধ

উতল হাওয়া দক্ষিণ হাওয়ার মধ্যে বরফের কুচি। হেনরিসকে গরমজলে স্নান করিয়ে পরিপাটি করে জামাকাপড় পরিয়ে ওর জানলার সামনে সোফায় বসিয়ে ওঁর সাহায্যকারী মনে করিয়ে দিলেন আজ  এডভাইসার আসবার দিন ।
oldage home এর নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে একদিন একজন বয়স্কদের মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা বিশেষজ্ঞ কথাবার্তা বলে কিছুটা সহনীয় করে তোলে বৃদ্ধকাল … এদের এডভাইসার বলে ।
লিন্ডা, সেই হাসিখুশি  তরুণীর আসবার কথা  শুনেই মন ভালো হয়ে যায় হেনরিসের।
লিন্ডা এসেই বলে
—- কী কথা দিয়ে যেন শেষ হয়েছিল আমাদের আগের দিনের আলোচনা হেনরিস?
—– যুদ্ধ,বিপ্লব,দেশটাকে বদলে স্বর্গরাজ্য করা ।
—–যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে,তোমরা জিতে গেছো হেনরিস,সবার মাথার ওপর ছাদ,খাদ্য,ঘরে ঘরে গরম জল ঠান্ডা জল,আর কেন বিপ্লব, কেন যুদ্ধ?
বাচ্চাদের পুতুল চাইবার ভঙ্গিতে বৃদ্ধ মাথা দোলায়…
——– না না আমার চাই,চাই ই যুদ্ধ ।
পেশাগত  সহানুভূতি দেখিয়ে .. ধীরে ধীরে হেনরিসের শিরা ওঠা হাতে হাত বোলাতে বোলাতে লিন্ডা বলেন
——-  তা কী চাইবে এবার যুদ্ধে? কিসের জন্য যুদ্ধ হবে?
হেনরিসের কোঁচকানো চোখ দিয়ে জলস্রোত গড়িয়ে পড়ে তার ঝুলে পড়া  গালে
——– বিশাল একটা কাঠের গামলায় অনেকটা জল তাতে আমরা তিন ভাই স্নান করবার পর ওই জলেই মা ঘরের সব কাজ সারবেন। অমন একটা জল কষ্টের দিন …আর রোজি .. রোজির সাথে চাঁদের রাতে জঙ্গলে আদরে মাখামাখির রাতটা, রাতগুলো।


রীতা চট্টোপাধ্যায় জন্ম কলকাতা। শিক্ষা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। কর্মস্থান জার্মানির বন। আগ্রহ প্রকৃতি ও সাহিত্যে।